যেন ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াই - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

যেন ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াই


এ যেন ডেভিড বনাম আর্মি অব গোলিয়াথের লড়াই। যেখানে ডেভিডের ভূমিকায় নাথান অ্যান্ডারসনের বিনিয়োগ গবেষণা সংস্থা হিনডেনবার্গ রিসার্চ। আর গোলিয়াথ— বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি তথা আদানি গ্রুপ। যে লড়াইয়ে এর মধ্যে হিনডেনবার্গের এক রিপোর্টে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠভাজন গৌতম আদানি। 


মার্কিন সংস্থা হিনডেনবার্গ বলছে, আদানি গ্রুপের ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা। অ্যাকাউন্টিংয়েও রয়েছে সমস্যা। তারা দাবি করেছে, আদানি গ্রুপ বহু বছর ধরেই অভাবনীয় স্টক ম্যানিপুলেশন এবং অ্যাকাউন্টিং জালিয়াতিতে জড়িত।


এই এক প্রতিবেদনে টলে গেছে আদানির বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য। ব্লুমবার্গের বিলিওনিয়ার ইনডেক্স বলছে, বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী থেকে রাতারাতি নেমে এসেছেন ১০ নম্বরে। অন্যদিকে ফোর্বসের শীর্ষ ধনীর তালিকায় তার অবস্থান ১৫ নম্বরে। ফোর্বসের তালিকার ৯ নম্বরে আছেন আরেক ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানি।


যদিও আদানি গ্রুপ হিনডেনবার্গের ওই প্রতিবেদনকে ‘ভিত্তিহীন ও সন্দেহজনক’ বলে বিবৃতি দিয়েছে। তাতে শেয়ার মার্কেটে পতন ঠেকানো যায়নি। স্টক মার্কেটে ৭০ বিলিয়ন ডলারের মূল্য হারিয়েছে আদানি গ্রুপ।


ভারতভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ব্রোকারেজ স্টক্সবক্সের পরিচালক (গবেষণা) স্বপ্নীল সাহা বলছিলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে স্টক মার্কেট সেন্টিমেন্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়। এখন এই সেন্টিমেন্ট পুরোপুরি আদানি গ্রুপের বিপক্ষে।’


কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নিউইয়র্কভিত্তিক ছোট অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থাটি আদানি গ্রুপের এই পতন কীভাবে ডেকে আনল? ডেভিড বনাম গোলিয়াথারে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ-ই বা কী?


কলেজ ড্রপআউট গৌতম আদানিকে তুলনা করা হয় জন ডি রকফেলারের সঙ্গে। যিনি ১৮শ শতকে মনোপলি বিজনেসের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। আদানির গ্রুপের আজকের যেই সম্পদ তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ৩০ বছর আগে। ব্লুমবার্গের বিলিওনিয়ার ইনডেক্স বলছে, গত সপ্তাহে গৌতম আদানির ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে হারিয়েছেন ৪০ বিলিয়ন ডলার। যদিও এখনও তিনি এশিয়ার সেরা ধনী। তবে তার ঘাড়েই নিঃশ্বাস ফেলছেন আরেক ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানি। এই মুহূর্তে সম্পদের ব্যবধান মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের।


গত বছর প্রথমবারের মতো জেফ বেজোসকে হটিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী হন গৌতম আদানি। প্রথম কোনো এশিয়ান হিসেবে বিলিওনিয়ার ইনডেক্সে এত ওপরে ওঠেন তিনি। গত এক সপ্তাহে সেখান থেকে ১০ নম্বরে নেমে গেছেন।


বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলছেন, তিনি যত দ্রুত সম্পদে পাহাড় গড়েছেন তা অভাবনীয় ও অস্বাভাবিক।


১৯৩৭ সালে মার্কিন বাজারে অন্যতম আর্থিক কেলেঙ্কারি ছিল ‘হিনডেনবার্গ কাণ্ড’। সেই ঘটনার সূত্রেই নিজের সংস্থার নাম দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা নাথান। লক্ষ্য— এমন সব আর্থিক ফাঁক খুঁজে বের করা, যা ধরতে পারলে আগে থেকেই বিপর্যয়ের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা যায়।


২০১৭ সালে একটি ফরেনসিক আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে হিনডেনবার্গ প্রতিষ্ঠা করেন নাথান। ইক্যুইটি, ক্রেডিট ও ডেরিভেটিভ বিশ্লেষণ ছিল তাদের মূল কাজ।


নিজস্ব ওয়েবসাইটে হিনডেনবার্গ বলেছে, তারা ‘মানবসৃষ্ট’ জালিয়াতি— যেমন অ্যাকাউন্টিং অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে। কোম্পানিটি তাদের নিজস্ব মূলধনই বিনিয়োগ করে।


২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ইলেকট্রিক ট্রাক প্রস্তুতকারক নিকোলা কর্পের বিরুদ্ধে কাজ করে ব্যাপক পরিচিত পায় হিনডেনবার্গ। দাবি করে, নিকোলা তাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করেছে।


মূলত নিকোলার একটি ভিডিওকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন নাথান অ্যান্ডারসন। ভিডিওটিতে নিকোলার ইলেকট্রিক ট্রাকটিকে উচ্চগতিতে চলতে দেখা যায়। কিন্তু নাথান দাবি করেন, ট্রাকটি আসলে খাড়া পাহাড় থেকে নেমে আসছিল বলেই অমনটি দেখাচ্ছিল।


এ প্রতিবেদনের পর বিনিয়োগকারীদের ভুয়া তথ্য দেয়ার অভিযোগে নিকোলার প্রতিষ্ঠাতা ট্রেভর মিল্টনকে গত বছর দোষী সাব্যস্ত করেন মার্কিন এক জুরি। কোম্পানিটির মূল্য ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ১.৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।


আদানি গ্রুপের সমস্ত কোম্পানির ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে হিনডেনবার্গের প্রতিবেদনে। দাবি করা হয়েছে, কারচুপি করে ধনী হয়েছেন আদানিরা। শেয়ার বাজারে তাদের যে অবস্থান, তার অনেকটাই কৃত্রিম। ওই প্রতিবেদনে আদানি গ্রুপকে ৮৮টি প্রশ্ন করা হয়।


জবাবে আদানি গ্রুপ জানিয়েছিল, এই রিপোর্ট আসলে দেশের ওপর আঘাত। হিনডেনবার্গের  পাল্টা সাফ জবাব, ‘জাতীয়তাবাদ দেখিয়ে জালিয়াতি আড়াল করা যাবে না।’


ব্লুমবার্গের এক রিপোর্টে জানা গেছে, ২০২০ সালের এভাবে ২০টি কোম্পানির বিপক্ষে অনুসন্ধান চালায় হিনডেনবার্গ। প্রতিবেদন প্রকাশের পরই এসব কোম্পানি গড়ে ১৫ শতাংশ সম্পদ হারায়।


আদানি গ্রুপও কি এমন পরিণতির দিকে যাবে? এমন প্রশ্নে আর্থিক উপদেষ্টা সংস্থা সানা সিকিউরিটিজের প্রতিষ্ঠাতা রজত শর্মা বলছিলেন, ‘তারা (আদানি গ্রুপ) কোথাও যাচ্ছে না। আদানি সুপ্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানি। বিশেষ করে তারা এমন সব ব্যবসা করে থাকে যেগুলো সিস্টেমেটিক্যালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’


তবে বিজনেস টাইকুন আদানি গ্রুপ আবার প্রত্যাবর্তন করলেও কাজের অভাব নেই হিনডেনবার্গের। সম্প্রতি নাথান অ্যান্ডারসন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলছিলেন, ‘যদি কখনো আমার মনে হয় আমেরিকার বেশিরভাগ করপোরেট জালিয়াত নির্মূল হয়ে গেছে সম্ভবত গ্রামে ফিরে টমেটো চাষের ঘোষণা দেব।’

কোন মন্তব্য নেই