সুখী হতে কী লাগে, সবার উত্তর কি এক?
জীবন ও সমাজ
সুখের সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে ভালো চাকরি, অর্থবিত্ত ও সামাজিক পরিচিতিই সাফল্যের মাপকাঠি। আবার কারও কাছে মানসিক শান্তি, নিজের পছন্দমতো জীবনযাপন কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাই একজনের সুখের ধারণা দিয়ে অন্যের জীবনকে বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সম্প্রতি একজন নারীর জীবন বেছে নেওয়ার গল্প নতুন করে ভাবিয়েছে সুখের অর্থ নিয়ে। বুয়েট থেকে পড়াশোনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি এবং বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার মতো অর্জন থাকার পরও তিনি ভিন্ন জীবনপথ বেছে নিয়েছেন বলে আলোচনায় এসেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত কারও কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে, আবার কারও কাছে এটি নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার উদাহরণ।
প্রশ্ন হলো, প্রচলিত সাফল্যের পথ থেকে সরে দাঁড়ালেই কি কেউ ভুল করেন? নাকি প্রত্যেক মানুষের নিজের মতো করে ভালো থাকার অধিকার রয়েছে?
সুখের সংজ্ঞা সবার এক নয়
কেউ অর্থ উপার্জন করে বাড়ি-গাড়ি গড়ে আনন্দ পান, কেউ আবার সেই অর্থ খরচ করে নতুন জায়গা ঘুরে দেখতে ভালোবাসেন। কারও কাছে পদমর্যাদা ও পরিচিতি গুরুত্বপূর্ণ, আবার কেউ নিরিবিলি জীবনেই স্বস্তি খুঁজে পান। কেউ রান্না করে অন্যকে খাওয়াতে ভালোবাসেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে সাধারণ একটি খাবার ভাগ করে নিয়েই তৃপ্ত হন।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নিজের পছন্দকেই সবার জন্য সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়। অন্য কেউ কেন একই পেশা, জীবনযাপন কিংবা অর্জনের পথে হাঁটছেন না—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়েই অনেক সময় তাঁকে ছোট করা হয়।
সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ভালো চাকরি, বেশি আয় কিংবা পরিচিতি থাকলেই জীবন সফল। কিন্তু বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও কারও মনে অস্থিরতা থাকতে পারে। আবার সাধারণ জীবনযাপন করেও কেউ মানসিক শান্তি খুঁজে পেতে পারেন। তাই শুধু পেশা বা সম্পদ দিয়ে মানুষের সুখ পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
সুখের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক
সুখ কেবল ব্যক্তিগত মানসিকতা কিংবা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। মানুষের চারপাশের পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ভালো থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনগুলোতে ফিনল্যান্ডসহ নরডিক দেশগুলোর অবস্থান প্রায়ই আলোচনায় আসে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, মানুষের জীবন সম্পর্কে মূল্যায়নের পাশাপাশি সামাজিক সহায়তা, পারস্পরিক আস্থা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং জীবনযাপনের পরিবেশও ভালো থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডেনমার্কের মতো দেশে সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। সুইডেনেও সন্তান লালন-পালনের জন্য অভিভাবকদের ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। এসব সুবিধা মানুষের জীবনের কিছু অনিশ্চয়তা কমাতে সাহায্য করে।
ভুটানও মানুষের সামগ্রিক ভালো থাকাকে গুরুত্ব দিতে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা সামগ্রিক জাতীয় সুখের ধারণা সামনে এনেছে। এই ধারণা মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করলেই মানুষের জীবনের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সুখের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে নিজের পছন্দমতো জীবন বেছে নেওয়া সহজ নয়। জীবিকার অনিশ্চয়তা, ঋণের চাপ, চিকিৎসার ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা এবং পরিবারের দায়িত্ব তাঁদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
কেউ হয়তো পছন্দের কাজ করতে চান, কিন্তু আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন না। কেউ চাকরি ছেড়ে নিজের মতো করে জীবন কাটানোর কথা ভাবলেও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
এ কারণে সুখকে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে দেখলে বাস্তবতার অনেক দিক বাদ পড়ে যায়। মানুষের নিজের জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার পাশাপাশি এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশও প্রয়োজন, যেখানে অসুস্থতা, বেকারত্ব কিংবা অন্য কোনো সংকট তাঁর জীবনকে পুরোপুরি অনিশ্চিত করে তুলবে না।
অন্যের সুখের মাপকাঠি কেন নিজের হাতে?
একজন মানুষ যে জীবনকে সাফল্য মনে করেন, অন্য কারও কাছে সেই জীবন চাপ কিংবা বন্দিত্বের মতো মনে হতে পারে। আবার যে সাধারণ জীবনকে কেউ তুচ্ছ ভাবেন, অন্য কারও কাছে সেটিই হতে পারে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত শান্তি।
তাই অন্যের জীবন সম্পর্কে মত দেওয়ার আগে তাঁর পরিস্থিতি, পছন্দ ও অগ্রাধিকার বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। নিজের মূল্যবোধ অন্যের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে প্রত্যেককে নিজের মতো করে ভালো থাকার সুযোগ দেওয়াই বেশি মানবিক।
শেষ পর্যন্ত সুখের কোনো একক সংজ্ঞা নেই। কারও কাছে সুখ নিজের স্বপ্ন পূরণে, কারও কাছে পরিবারকে সময় দেওয়ায়, আবার কারও কাছে নিজের মনের কথা লিখে প্রকাশ করায়।
আমার সুখের সংজ্ঞার সঙ্গে আপনার সংজ্ঞা মিলতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং ভিন্ন পছন্দ ও জীবনপথকে সম্মান করতে পারলেই হয়তো আমরা একে অন্যের ভালো থাকাকে আরও সহজভাবে গ্রহণ করতে শিখব।

কোন মন্তব্য নেই