মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়াচ্ছেন ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক, স্নাতকে ছিল না সংশ্লিষ্ট বিষয় - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়াচ্ছেন ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক, স্নাতকে ছিল না সংশ্লিষ্ট বিষয়

 


নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24

ঢাকা, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ঘাটতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ানো প্রায় ১০ হাজার এবং গণিত পড়ানো ১০ হাজারের বেশি শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল না। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে অন্য বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষকদের ইংরেজি ও গণিতের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

ইংরেজি ও গণিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি পড়ান ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক পাস করলেও স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। এ ছাড়া ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে ৪ হাজার ২১২ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত পড়ান ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক পাস হলেও স্নাতকে গণিত বিষয় ছিল না।

অর্থাৎ, দুই বিষয় মিলিয়ে ২০ হাজার ১৫১ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা না করেও ইংরেজি ও গণিতের ক্লাস নিচ্ছেন।

শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে স্নাতকে কোনো বিষয় না থাকা মানেই একজন শিক্ষক সেই বিষয়ে পড়ানোর অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তাঁর অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের দক্ষতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষকসংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকলে একই শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হতে পারে। এতে পাঠ্যসূচি শেষ করা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলেও শিক্ষকসংকটের চিত্র দেখা গেছে। বিদ্যালয়টিতে ইংরেজি বিষয়ের আটজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত ছিলেন চারজন। গণিত বিষয়ে ছয়জনের বিপরীতে শিক্ষক ছিলেন চারজন।

শিক্ষকসংকটের কারণে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদেরও ইংরেজি ও গণিতের ক্লাস নিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ঢাকার বাইরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ জন ছাত্রী থাকলেও শিক্ষক ছিলেন মাত্র দুজন। প্রয়োজনীয় পাঠদান অব্যাহত রাখতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের কথা জানিয়েছেন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের মতো ধারাবাহিক অনুশীলননির্ভর বিষয়ে একবার ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে সেই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।

বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা

শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময়, উপযুক্ত শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত পড়াশোনার জন্য কোচিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে। এতে পরিবারের শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

সব পরিবারের পক্ষে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে কোচিং করানো সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যালয়ের পাঠদানে ঘাটতি থাকলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়তে পারে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি কমাতে বিদ্যালয়েই কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই বহু শিক্ষকের

শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১৬ হাজার ৭৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষক বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।

এ ছাড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার আরও কম। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ পেশাগত প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো বিষয়ে ভালো জ্ঞান থাকা এবং সেই বিষয় কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারা এক বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের বয়স ও শেখার সক্ষমতা বুঝে পাঠ পরিকল্পনা করা, কঠিন বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করা এবং শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে উদ্যোগের কথা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বক্তব্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সামগ্রিক শিক্ষকসংকট রয়েছে। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ জোরদারের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে খান একাডেমি বাংলাদেশের মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের পাঠদানের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল হলে তার প্রভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও পড়তে পারে। উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন এবং দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ইংরেজি ও গণিতের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই সমস্যার সমাধানে শুধু শিক্ষক নিয়োগ বাড়ানো নয়, কোন বিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে পরিকল্পিতভাবে নিয়োগ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা যাচাই, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা যেন বিদ্যালয়েই প্রয়োজনীয় শিক্ষা পায় এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করেও শেখার সুযোগ পায়—এ লক্ষ্য সামনে রেখে শিক্ষকসংকট ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন। কারণ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ভিত্তি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষেই।

Times Express 24 — শিক্ষা, শিক্ষকতা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খবরের নির্ভরযোগ্য আপডেট।

কোন মন্তব্য নেই