অরক্ষিত ক্রসিং, যেন মৃত্যুকূপ - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

অরক্ষিত ক্রসিং, যেন মৃত্যুকূপ



অরক্ষিত ক্রসিং, গেটম্যানের অবহেলা আর জনসচেতনতার অভাবে মরণফঁাদে পরিণত হয়েছে রেলপথের লেভেল ক্রসিংগুলো। এসব কারণে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। গত কয়েক মাসে লেভেল ক্রসিংগুলোতে রেলের সঙ্গে অন্যান্য পরিবহনের সংঘষের্ ও ট্রেনে কাটা পড়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সবের্শষ রোববার ভোরে চট্টগ্রামের বারৈয়ারহাট লেভেল ক্রসিংয়ে ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে খাগড়াছড়িগামী এস আলম পরিবহনের একটি বাসের সংঘষের্র ঘটনা ঘটে। এতে দুই বাসযাত্রী নিহত হন। আহত হয়েছেন অন্তত আরও ২৫ জন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেটম্যানের অবহেলার কারণে বারইয়ারহাট লেভেল ক্রসিংয়ে ওই ভয়াবহ দুঘর্টনা ঘটে। দুঘর্টনার পর থেকে রেল ক্রসিংয়ের দায়িত্ব থাকা গেটম্যান মো. আরিফ পলাতক রয়েছে। গেটম্যানদের অবহেলায় বারইয়ারহাট লেভেল ক্রসিংয়ে দুঘর্টনা কোনো নতুন বিষয় নয়। ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই এক দুঘর্টনায় পতিত হয় ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা বিজয় এক্সপ্রেস। রোববারের মতোই ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রামমুখী বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ধাক্কা দেয় খাগড়াছড়িগামী রিফাত পরিবহনকে। ওই দুঘর্টনায় কেউ মারা না গেলেও ১৫ জন বাসযাত্রী আহত হন। সেদিন গেটম্যান ছাবের ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই দুঘর্টনার মাত্র সাত দিন আগে ২৪ জুলাই এই লেভেল ক্রসিংয়েই গেটম্যানের অবহেলার বড় ধরনের দুঘর্টনায় পরতে যাচ্ছিল চট্টগ্রামমুখী আন্তঃনগর ট্রেন সোনার বাংলা। তবে একদম শেষ মুহূতের্ চালকের বিচক্ষণতায় অল্পের জন্য রক্ষা পায় হাজারখানেক যাত্রী। সেই দিনও লেভেল ক্রসিংয়ে গেট না ফেলে অন্যত্র চলে যায় গেটম্যান ছাবের। পরে গেট থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে বারইয়ারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে চালক ট্রেনটি থামান। বিভিন্ন সময় ট্রেন দুঘর্টনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোটর্ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কয়েকটি সুনিদির্ষ্ট কারণে দুঘর্টনাগুলো ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ লেভেল ক্রসিং, বৈধ ক্রসিংগুলোতে প্রয়োজনীয় গেটম্যান না থাকা, গেটম্যানদের গাফিলতি এবং যথাযথ সিগন্যালের অভাব, সিগন্যাল না মানা ও অসাবধানতা। রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত ২০ বছরে রেলওয়ে পূবার্ঞ্চলে ৫৭০টিরও বেশি দুঘর্টনা ঘটেছে। চলতি বছরের গত আট মাসে রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩২০ জনের। ২০১৭ সালে মৃত্যু হয়েছে ৮১২ জনের। ২০১৬ সালে রেল দুঘর্টনা ও রেললাইনে কাটা পড়ে মারা যান ৩০৫ জন। ২০১৫ সালে মারা গেছেন ২৯২ জন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলওয়ে পূবার্ঞ্চলের দুই-তৃতীয়াংশ লেভেল ক্রসিংয়েই কোনো গেটম্যান নেই। এর বাইরে আরও সহস্রাধিক অবৈধ লেভেলক্রসিং থাকলেও এগুলোতেও নেই কোনো নজরদারি। গেটম্যানবিহীন লেভেল ক্রসিংগুলোতে যানবাহন ও পথচারীদের নিজ দায়িত্বে চলাচলের জন্য সতকর্তামূলক সাইনবোডর্ টাঙিয়ে রেখে দায় সারছে রেলওয়ে কতৃর্পক্ষ। ফলে প্রায় দুঘর্টনা ঘটেই চলেছে। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে একের পর এক প্রাণ। রেলের পূবার্ঞ্চলে এক হাজার ২৪৫টি বিভিন্ন ধরনের লেভেল ক্রসিং রয়েছে। রেলের পূবার্ঞ্চলের হিসেবে অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৮৮১টি। এর বাইরে আরও সহস্রাধিক অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। বৈধ ক্রসিংগুলোতেও আবার প্রয়োজনীয় গেটম্যান নেই। প্রায় সাড়ে ১২০০ বৈধ ক্রসিং তদারকির জন্য স্থায়ী গেটম্যান রয়েছেন মাত্র ৪৩৪ জন। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যমতে, রেলের পূবার্ঞ্চলে এলজিইডির অধীনে ২৫৩টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। সড়ক ও জনপথের ৬, পৌরসভা ৬৫, সিটি করপোরেশন ১৯, ইউনিয়ন পরিষদ ৩২৪, জেলা পরিষদ ১৩, বেসরকারি সংস্থা ৩, চট্টগ্রাম বন্দর কতৃর্পক্ষ ৩ এবং অন্যান্য সংস্থার অধীনে ৯২টি ক্রসিং রয়েছে। বাকি ৩৩টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তা জানে না রেলওয়ে কতৃর্পক্ষ। রেলওয়ে পূবার্ঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় গ্রামীণ সড়ক পাকা হওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা ও রাস্তা উভয়ই বেড়েছে। কী পরিমাণ সড়ক ও কত যানবাহন বাড়ল তার প্রকৃত হিসাব বা তথ্য রেল কতৃর্পক্ষের কাছে নেই। একই কারণে রেল কতৃর্পক্ষের অনুমতি ছাড়াই অননুমোদিত রেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা বেড়েছে। রেলগেট সুরক্ষার ব্যয় সংকুলান করতে পারছে না রেল কতৃর্পক্ষ। তারপরও গত ফেব্রæয়ারি মাসে অনাকাক্সিক্ষত দুঘর্টনা রোধে লেভেল ক্রসিংয়ে এক হাজার ৩৮ গেটম্যান নিয়োগ দিয়েছে রেলওয়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেলের পূবার্ঞ্চলে এক হাজার ২৪৫টি বিভিন্ন ধরনের লেভেল ক্রসিং রয়েছে। অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা আরও সহস্রাধিক। এ অবস্থায় নতুন নিয়োগ পাওয়া অস্থায়ী গেটম্যান দিয়েও সব লেভেল ক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। একটি লেভেল ক্রসিংয়ে তিনজন করে গেটম্যান কাজ করলেও মাত্র ৩৪৬টি লেভেলক্রসিং সুরক্ষিত করা যাবে।’

কোন মন্তব্য নেই