পূজা উপলক্ষ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজশাহীর প্রতিমা কারিগররা - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

পূজা উপলক্ষ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজশাহীর প্রতিমা কারিগররা



বছর ঘুরে আবারো ঘনিয়ে আসছে দুর্গাপূজা। পূজা উপলক্ষ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজশাহীর প্রতিমা কারিগররা। জোরেসোরে চলছে প্রতিমা তৈরীর কাজ। এছাড়াও পূজা উদযাপনের জন্য প্রস্তুত রাজশাহী জেলা ও নগর পূজা উদযাপন পরিষদ।
নগরীর আলুপট্টির শেখের চরে’র বাসিন্দা কার্তিক পাল। পেশায় প্রতিমা কারিগর। ১৫ বছর বয়স থেকেই বংশ পরাম্পরায় তৈরি করে আসছেন প্রতিমা। তার বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছেন ৫ থেকে ৬ জন কারিগর। সবাই ব্যস্ত প্রতিমার গায়ে কাঁদামাটির প্রলেপ লাগাতে। আর ক’দিন পর এসব প্রতিমার গায়ে রঙ-তুলির আঁচড় পড়বে বলে জানান শিল্পীরা। জানা যায়, প্রায় ২৩ টি প্রতিমার কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় এক মাস আগে থেকে অর্ডার নেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি।
তিনি জানান, পঞ্চমীর আগেই সব প্রতিমা ডেলিভারী দিতে হবে। তাই বাংলা আষাঢ় মাসের ১৫ তারিখ থেকেই তারা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। সময় মতো প্রতিমা সরবরাহ করতে দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিমা তৈরির অর্ডার পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
একটি প্রতিমা তৈরিতে শিল্পীদের প্রায় ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। প্রতিমা তৈরির জন্য লাগে ৩ থেকে ৪ ভ্যান মাটি। খড় লাগে ৫ থেকে ৬ পৌন। এছাড়া পাট, কাঠ, বাঁশ, দড়ি, পেরেক, সুতা, ধানের তুষ ও কয়েক ধরনের রঙ কিনতে তাদের এই টাকা খরচ হয়। রাজশাহীতে একেকটি প্রতিমা ১৮ থেকে ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
কার্তিক চন্দ্র জানান, প্রতিমার আকার ও ধরণের উপর নির্ভর করে সময় কম বেশি লাগে। ছোট বা মাঝারী আকারের প্রতিমা তৈরীতে সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ দিন। আবার কোন কোন প্রতিমার ক্ষেত্রে ১ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। প্রতিমা তৈরিতে কয়েকজন শিল্পী একসঙ্গে কাজ করেন। একেকজন শিল্পী প্রতিমার এক এক কাজে হাত দেন। সবার সম্মিলিত কাজে পূর্ণতা পায় একেকটি প্রতিমা।
একটি প্রতিমার প্রায় তিনটি করে সেট থাকে। সেটগুলোতে দেবী দূর্গার পাশে স্থান পায় তার সন্তান লক্ষী, গণেশ, স্বরসতী, কার্তিক ও তাদের বাহক সিংহ, হাস, ময়ূর, পেঁচা, ইদুর ইত্যাদি। দাম ও ক্রেতাদের চাহিদার উপর নির্ভর করে একেকটি প্রতিমায় এক বা একাধিক অসুর রাখা হয়।
ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী তৈরী করা হয় প্রতিমাগুলো। প্রতিমায় কারও পছন্দ মাটির অলঙ্কার। প্রতিমার সাথেই সংযুক্ত করে মাটি দিয়ে তৈরী করা হয় এগুলো। এগুলোতে রঙ তুলির আঁচড় পড়তেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে দেবী দূর্গা। এছাড়াও আলাদাভাবে অলঙ্কার ও শাড়ী পরানো প্রতিমারও রয়েছে বিশেষ রুপ। এগুলোর ক্ষেত্রে আগে প্রতিমাতে রঙ করা হয়, তারপর শাড়ী ও অলঙ্কার পরানো হয়। প্রতিমার জন্য আলাদাভাবে কেনা হয় শাড়ি ও অলঙ্কার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভারতীয় শাড়িগুলো ব্যবহার করেন কারিগররা।
প্রতিমা তৈরীর জন্য মাটিগুলোকে আগে থেকে প্রস্তুত করতে হয়। মাটি মেখে তার সাথে বিভিন্ন উপকরণ মেশানো হয়। সাধারণত প্রতিমা তৈরীতে এঁটেল মাটি ব্যবহার করা হয়। মাটিগুলো দুর-দুরান্ত থেকে কিনে আনা হয়। মাটির সাথে ব্যবহার করা হয় কুটি করে কাটা পাট ও খড়, ধানের তুষ ইত্যাদি।
একেকটি প্রতিমা ১৮, ২২, ২৫, ৩০, ৪০, ৫৫ ও ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে বলে জানান কার্তিক। তবে এই টাকার সিংহ ভাগই প্রতিমা বানাতে খরচ হয়। যার ফলে একেকটি প্রতিমাতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লাভ হয়। তারপরেও প্রতিমা বিক্রির লাভ দিয়ে সারাবছরজুড়েই ডাল-ভাত খেয়ে জীবন চলে যায় বলেন কার্তিক।
এবার রাজশাহী জেলায় মোট ৪৫৭টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে মহানগরীর ১২টি থানার অধীনে প্রায় ৮০টি পূজামন্ডপে দূর্গোৎসব আয়োজন করা হবে। যার বেশিরভাগই বোয়ালিয়া ও রাজপাড়া থানার অন্তর্গত বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ রাজশাহী মহানগর সাধারণ সম্পাদক শ্যামল কুমার ঘোষ।


তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা আগামী মঙ্গলবারের দিকে সিটি এসবি’র সাথে মিটিং করব। মোটামুটি সব মহলের সাথেই আমাদের আলোচনা প্রায়ই শেষের দিকে। আমরা আশা করব, প্রতিবারের মতই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। রাজশাহী শান্তির শহর, এখাকার মানুষ শান্তিপ্রিয়। আমরা প্রতিবছরই কোন অনাকাঙ্খিত দূর্ঘটনা ছাড়াও সবাই মিলে পূজা উদ্যাপন করি। সরকারী অনুদান এখনো পাননি এবং প্রতিবারের ন্যায় এবারো পাবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে, পূজাকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে বলে জানান রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) ইফতেখায়ের আলম। তিনি বলেন, নগরজুড়ে প্রতিমা তৈরীর কাজ চলছে। কোন অঘটনের আশঙ্কা নেই। তারপরও থানাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া আছে নজরদারী করতে। পূজা চলাকালীন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। বসানো হবে অতিরিক্ত চেকপোস্ট। প্রত্যেকটি মন্ডপেই থাকবেন নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি থাকবেন আনসার সদস্যরাও।

পরিচালনা করা হবে ভ্রাম্যমান আদালত। এছাড়াও র‌্যাবের টহল থাকবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

দেবী দূর্গা হলেন শক্তির রূপ, তিনি পরব্রহ্ম। অন্যান্য দেব-দেবী ও মানুষের মঙ্গলার্থে তাঁর বিভিন্ন রূপের প্রকাশ মাত্র। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুসারে দেবী দূর্গা ‘দূর্গতিনাশিনী’ বা সকল দুঃখ দুর্দশার বিনাশকারিনী। পুরাকালে দেবতারা মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর’র শরীর থেকে আগুনের মত তেজরশ্মি একত্রিত হয়ে বিশাল এক আলোক পূঞ্জে পরিণত হয়। ঐ আলোক পুঞ্জ থেকে আর্বিভূত হলেন দেবী দুর্গা। দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত আদ্যাশক্তি মহামায়া অসুর কুলকে একে একে বিনাশ করে স্বর্গ তথা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে শান্তি স্থাপন করেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই