ইউরিক এসিড কি মানব দেহে ইউরিক এসিডের পরিমান বেড়ে গেলে কি করবেন
ইউরিক এসিড কি: ইউরিক এসিড এক প্রকার খাদ্যরস। অনেক সময় খাবারের মাধ্যমে বেশি পরিমাণ ইউরিক এসিড গ্রহণ করা হয়। লাল মাংস, ক্রিম, রেড ওয়াইন ইত্যাদি গ্রহণ করলে এবং কিডনি রক্ত থেকে যথেষ্ট পরিমাণে তা ফিল্টার করতে না পারলে বাতের উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু সহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ইউরিক এসিড জমা হতে থাকে এবং তাতে অস্থিসন্ধি ফুলে যায় এবং ব্যথা হয় ইউরিক এসিড বাড়লে কী খাবেন?: আমরা যা খাই তার যতটুকু পুষ্টি উপাদান দেহের প্রয়োজন, শোষন ও বিপাক এর মাধ্যমে তার চাহিদা পূরণের পর বাকিটা দেহ থেকে বর্জ্য হিসাবে মল,মূত্র, ঘাম, শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ইউরিক এসিড ও এমন একটি উপাদান যা দেহের নির্দিষ্ট পরিমানের বেশি হলে দেহ থেকে অপসারণের মাধ্যমে আমাদের দেহে সামঞ্জস্যতা থাকে।
স্বাভাবিকভাবে ইউরিক এসিড, পিউরিন সমৃদ্ধ গৃহীত খাদ্য থেকে আমাদের দেহের যকৃতে উৎপন্ন হয়ে রক্তে মিশে যায় এবং রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয়ে কিডনিতে পৌছায়। কিডনি একে দেহ থেকে বের করে দেয়।মূলতঃ আমাদের দেহের অভ্যন্তরে তিন ভাগের দুই ভাগ ইউরিক এসিডই যকৃত বা লিভারে তৈরি হয়। বাকিটা অর্থাৎ এক ভাগ খাবার থেকে গৃহীত হয়। যকৃতে উৎপন্ন বাড়তি ইউরিক এসিড কিডনির কার্যকারিতায় মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে অপসারণ হয়। কিন্তু মূত্রের মাধ্যমে যা বের হয় এবং যকৃতে যা উৎপন্ন হয়, খাবার থেকে অতিমাত্রায় পিউরিন গৃহীত হলে, এর ঘনত্ব বেড়ে, বেশি মাত্রায় উৎপন্ন হলে তখন রক্তে ইউরিক এসিড এর মাত্রা বেড়ে যায়। এখন বলব, মাত্রাতিরিক্ত ইউরিক এসিড আমাদের দেহে কি কি ক্ষতি করে? ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংগ বিশেষ করে কিডনির উপরে দীর্ঘদিন জমলে রেনাল স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। ফলে কিডনি ঠিক মত কাজ করে না এবং মুত্রের মাধ্যমে ইউরিক এসিড ও অন্যান্য বর্জ্য শরীর থেকে বের হতে পারে না।
কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং কিডনি ড্যামেজ ও হয়। এছাড়াও বাড়তি ইউরিক এসিড শরীরের হাড়ের বিভিন্ন জয়েন্টে ক্রিস্টাল এর মত হয়ে জমে যায়, যাতে করে অনেক রোগীর হাড়ের সন্ধিস্থলে ফুলে যায় এবং খুব ব্যাথা হয়। এই রোগের নামই গাউট বা গেটে বাত। সোডিয়াম এর মাত্রা নিয়ন্ত্রনে এর ভুমিকা থাকায় হাইপ্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়াও অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতাসহ হার্ট ডিজিজ এর সম্ভাবনা ও বেড়ে যায়। এখন জেনে নেই, আমাদের শরীরে ইউরিক এসিড কতটুকু থাকা প্রয়োজন? সাধারণত এর পরিমাণ পূর্ন বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৭ মিলিগ্রাম এবং নারীদের ৬ মিলিগ্রাম থাকা উচিত। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এর মাত্রা জেনে নেয়া উচিত। স্বাভাবিক এর চাইতে মাত্রাটা বেড়ে গেলে শীঘ্রই ডাক্তার দিখিয়ে ওষুধ গ্রহন করতে হবে এবং অবশ্যই খাবার গ্রহনে কিছু বিধিনিষেধ মেনে
চলতে হবে।
ইউরিক এসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে যে ৭ টি খাবার পিউরিন ভাঙার ফলেই ইউরিক এসিড উৎপন্ন হয়। পিউরিন শরীরে উৎপন্ন হয় এবং আমরা যে খাবার খাই তাতেও থাকে পিউরিন। কিডনি শরীর থেকে ইউরিক এসিড ভালোভাবে বের করে দিতে না পারলে শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন কারণে শরীরে ইউরিক এসিড জমা হতে থাকে। যেমন- অতিরিক্ত ওজন, অনেকবেশি অ্যালকোহল পান করা, পিউরিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, হাইপোথাইরয়ডিজম, মূত্রের অপ্রতুলতা, ইমিউন-সাপ্রেসিং ড্রাগ, কিছু মূত্রবর্ধক ইত্যাদি। রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা অনেক বেশি হলে তাকে হাইপারইউরেসেমিয়া বলে। ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে গেটে বাত এবং আরথ্রাইটিসের মত রোগ হতে পারে। ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধির প্রধান অপরাধী প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। কম পিউরিন যুক্ত খাবার গ্রহণ করাই এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকার প্রধান উপায়।
শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধির জটিলতাকে এড়িয়ে যাওয়ার ঔষধ গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াও জরুরী। এমন কিছু খাবার আছে যা ইউরিক এসিডের মাত্রাকে কমতে সাহায্য করে, সেরকম কিছু খাবারের কথাই জেনে নিন আজ। (i) অ্যাপল সাইডার ভিনেগার: আপেলের ম্যালিক এসিড ইউরিক এসিডের মাত্রাকে কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ৮ আউন্স কুসুম গরম পানিতে ১-৩ চা চামচ অ্যাপল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে দিনে ২-৩ বার পান করার পরামর্শ দেয়া হয়। তাজা আপেল খেলেও একই রকম ফল পাওয়া যায়। (ii) অলিভ অয়েল: অলিভ অয়েল ইউরিক এসিডের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলপাই বা জলপাই এর তেলের অ্যান্টিইনফ্লামেটরি গুণ আছে। আপনি আপনার সবজিতে, সালাদে বা পাস্তায় অলিভ অয়েল যোগ করতে পারেন।
(iii) বাদাম: কাজুবাদাম, কাঠবাদাম ও আখরোটের মত বাদাম ইউরিক এসিডের মাত্রাকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। কারণ এ বাদামগুলোতে ৪০ মিলিগ্রামের ও কম পিউরিন থাকে। তবে চিনাবাদাম খাওয়া এড়িয়ে যেতে হবে, কারণ ১ কাপ চিনাবাদামে ৮০ মিলিগ্রামের কাছাকাছি পিউরিন থাকে। (iv) লেবুর রস: বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ইউরিক এসিডের মাত্রা কমানোর সবচেয়ে ভালো প্রতিকার হচ্ছে সাইট্রিক এসিড। লেবু ভিটামিন সি ও সাইট্রিক এসিডের চমৎকার উৎস। ১ গ্লাস উষ্ণ পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে পান করুন দিনে ২/৩ বার। (v) পানি :দৈনিক প্রচুর পানি পান করা ইউরিক এসিডের মাত্রা কমায় এবং ইউরিক এসিডের স্ফটিক জমার কারণে সৃষ্ট ব্যথা কমতে সাহায্য করে। দৈনিক ১০-১২ গ্লাস পানি পান করুন। এছাড়াও তরল খাবার ও পানি বেশি আছে এমন ফল বেশি করে খান।
(vi) বেকিংসোডা: গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইউরিক এসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে বেকিংসোডা। এটি শরীরকে ক্ষারীয় অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে, যা ইউরিক এসিডকে অনেক বেশি দ্রবণীয় হতে সাহায্য করে এবং এর রেচনেও সাহায্য করে। (vii) ভিটামিন সি: উচ্চমাত্রার ইউরিক এসিডকে কমতে সাহায্য করে ভিটামিন সি। যারা ইউরিক এসিডের উচ্চমাত্রার সমস্যায় ভুগছেন তাদের ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন- পেয়ারা, কিউই, কমলা, টমেটো ইতাদি ফল খাওয়া উচিৎ। এখন আসি কোন কোন খাবার থেকে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যায়? যদি দেহে অতিমাত্রায় পিউরিনযুক্ত প্রানীজ প্রোটিন এর বিশ্লেষণ বেশি হয় এবং বিশেষ করে লাল মাংস যেমনঃ গরু, খাসী, ষাড় এর মাংস, মাছের ডিম, কলিজা ইত্যাদি যদি বেশী খাওয়া হয় তবে ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেক বেশী হয়। এছাড়াও পিউরিন সমৃদ্ধ শাক-সবজি ও বীচি জাতীয় খাবার যেমনঃ বিভিন্ন ডাল, বীচি, মাশরুম, পালং শাক, সীম, বরবটি, ফলের মধ্যে আম, কলা, সফেদা, খেজুর, কিসমিস, আখ, তাল ইত্যাদি।
এছাড়াও অতিরিক্ত চিনি খেলেও ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার প্রবনতা ত্বরান্বিত হয়। তাছাড়াও যারা ওবেসিটি স্টেজে আছেন তাদের ক্ষেত্রে ও ইউরিক এসিড বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ক্যান্সারের রোগীদের ও ইউরিক এসিড বেড়ে যেতে পারে। যারা খুব অনিয়মের মধ্যে খাওয়া দাওয়া করেন এবং অনেক বেশি সময় না খেয়ে থাকেন, তাদেরও ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।এখন বলছি, ইউরিক এসিড বেশি হলে কি কি খাওয়া যাবে? সাধারণত প্রানীজ খাবারের মধ্যে সব ধরনের বড় ও ছোট মাছ, মুরগীর মাংস, ডিম, লো ফ্যাট দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার এবং শস্যের মধ্যে জটিল কার্বোহাইড্রেট অর্থাৎ লালচাল, লাল গমের আটা, ওটস, সাগু, ভুট্টা, চিড়া ইত্যাদি শাক-সবজির মধ্যে লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, আলু, মিষ্টি আলু, পটল, ঝিংগা, চিচিংগা, করলা, কাকরোল, ঢেড়শ, কলার থোড়, মোচা, সবুজ কলমি শাক, লাউ/কুমড়ো শাক, গাজর, মূলা, বিটরুট, ক্যাপ্সিকাম, বাধাকপি, টমেটো, শসা ইত্যাদি, ফলের মধ্যে সাইট্রাস (টক) যুক্ত ফলগুলো যেমনঃ কমলা, মাল্টা, লেবু, আমলকি, জাম্বুরা, পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি, আঙুর, আমড়া, আনারস, জাম, বেদানা, খেজুর ইত্যাদি খাওয়া যাবে।

কোন মন্তব্য নেই