বড় স্বপ্ন, বড় বাজেট, বড় চ্যালেঞ্জ - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

বড় স্বপ্ন, বড় বাজেট, বড় চ্যালেঞ্জ



মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোট টাকার এই বাজেট আকারের দিক থেকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। তবে এর ‘বড়ত্ব’ শুধু আকারে নয়, আরও অনেক দিক দিয়ে। বাজেটে আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি)  জন্য ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার যে  ব্যয়ের পাশাপাশি আয়েরও বড় লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয়েছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষিত ‘স্মার্ট বাজেট’ এ। রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা যদি শতভাগ অর্জিতও হয় তবু বিশাল ঘাটতি থাকবে বাজেটে। এই ঘাটতির আকারও এ যাবতকালের সবচেয়ে বড়। আর এসব কারণে বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের চ্যালেঞ্জটিও অনেক বড়।

আজ ১৩ জুন, বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ‘উন্নয়নের সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ শিরোনামের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। জাতীয় সংসদে এটি নিয়ে আলোচনার পর প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে এতে। আর জাতীয় সংসদ পাস হওয়ার পর এই বাজেট আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।

Budget 2019-20.jpg

অর্থমন্ত্রী আ হ মুস্তফা কামাল গত কিছু দিন ধরে বলে আসছিলেন তার প্রস্তাবিত বাজেট হবে ‘স্মার্ট বাজেট’, আর তাতে থাকবে নানা চমক। কিন্তু কর হার অপরিবর্তিত রাখা ছাড়া খুব বেশি একটা চমক দেখা যায়নি প্রস্তাবিত বাজেটে। বরং অনেক ক্ষেত্রে এবারের বাজেটও আগের বাজেটগুলোর মতই গতানুগতিক। বাজেটের আকার বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে রাজস্ব আয় না বাড়াতে পারায় যে বিশাল ঘাটতি হবে তা মেটানো হবে দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে। ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাত তার চাহিদা মাফিক ঋণ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শেয়ারবাজারে।

বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্যে তেমন সুখবর নেই। মাথাপিছু গড় আয় বাড়লেও বাড়ানো হয়নি করমুক্ত আয়সীমা। টানা পঞ্চম বারের মতো আড়াই লাখ টাকাই থাকছে করমুক্ত আয়সীমা। অথচ উচ্চ হারের মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে পাঁচ বছর আগের একই জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে হলে তিন লাখ টাকার বেশি প্রয়োজন।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, গৃহিনীসহ সঞ্চয়পত্রের আয়ের উপর নির্ভরশীলদের জন্য বাজেটে রয়েছে দুঃসংবাদ। সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে নতুন বাজেটে।

তবে ঘোষিত বাজেটে কিছু নতুন এবং ইতিবাচক প্রস্তাবও রয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য কিছু প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈধ পথ তথা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য উৎসাহ দিতে এই প্রণোদনা দেওয়া হবে।



কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিতে কোনো দিক নির্দেশা না থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে পরীক্ষামূলকভাবে শস্য বীমা চালু করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আহ ম মুস্তফা কামাল।

বেকার তরুণদেরকে একটু আশার আলো দেখানোর চেষ্টাও রয়েছে আগামী অর্থবছরের বাজেটে। তরুণদের মধ্যে যারা স্বকর্মসংস্থানে আগ্রহী তাদেরকে বিনাসুদের ঋণসুবিধা দিতে বাজেটে একটি তহবিল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্যেও কিছু প্রণোদনা রাখা হয়েছে। লভ্যাংশ আয়ের করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া লভ্যাংশের উপর থেকে দ্বৈতকর তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কোম্পানগিুলো যাতে বোনাসের পরিবর্তে নগদ লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহী হয় সে লক্ষ্যে বোনাস লভ্যাংশের উপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। লভ্যাংশ না দিয়ে কোম্পানির রিজার্ভ বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতে বাড়তি রিজার্ভের উপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০১২ সালে প্রণীত মূল্যসংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে

বাজেটের আকার

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোট টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে তা সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি। আর সংশোধিত বাজেটের চেয়ে তা প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা, আর সংশোধিত বাজেটের আকার চার লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার জিডিপির ৮ দশমিক ১ শতাংশ।

বাজেট ব্যয়

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেটের ব্যয়ের বড় একটি অংশ যাবে পরিচালন খাতে। এতে ব্যয় হবে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবর্তক ব্যয় হবে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। যার একটি বড় অংশ ব্যয় হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে। আগামী অর্থবছরে এডিপি খাতে ব্যয় হবে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। আবর্তক খাতের আরও একটি অংশ ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করা হবে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ করা হবে ৫২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা।

ব্যয়ের আরেকটি খাত হচ্ছে এডিপিবহির্ভূত প্রকল্প। এ খাতে ব্যয় হবে ৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি স্কিমে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। আর কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি মূলধনী খাতে ব্যয় হবে ৩২ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা,খাদ্য হিসাবে ৩০৮ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম খাতে ব্যয়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৯৩৭ কোটি টাকা।

মোট আয়

বাজেট প্রস্তাবে বড় আকারের ব্যয় মেটাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর অনুদানসহ আয় হবে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান। চলতি বছর মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে। তবে রাজস্ব আয়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তা ১৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ১৬ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।



এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করা হচ্ছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ১০৩ কোটি টাকা,এটি জিডিপির ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআর কর রাজস্ব পরিমাণ ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। এনবিআরবহির্ভূত কর রাজস্ব পরিমাণ ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। কর ব্যতীত আয় হবে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ আগামী বছরে দাঁড়াবে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।

সামগ্রিক ঘাটতি

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ (অনুদানসহ) দাঁড়াবে ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া এ ঘাটতির পরিমাণ হবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। তবে অন্য বছরের ন্যায় জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই রাখা হয়েছে নতুন ঘাটতি বাজেট। এই ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

ঘাটতি পূরণে বড় অংকের ঋণ

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেবে। দেশি উৎসের মধ্যে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নেয়া হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের তুলনায় ৫ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হবে। অভ্যন্তরীণ অংশের আরেক খাত- সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে এ খাত থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা কম নেয়া হবে। এর বাইরে অন্যান্য খাত থেকে নেয়া হবে ৩ হাজার কোটি টাকা।


কোন মন্তব্য নেই