২৮ ঘণ্টা দুর্ভোগ - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

২৮ ঘণ্টা দুর্ভোগ


রেল লাইনের স্লিপারের সাথে সংযোগকারী লাইনে ক্লিপ (ডগ স্পাইক) লাগানই ছিলো না অনেক জায়গায়। চলছিলো লাইন সংস্কারের কাজ। সেই সঙ্গে বৃষ্টির কারণে দুর্বল ছিল লাইনের নিচের মাটি। ফলে দুর্বল সেই লাইনে তেলবাহী ট্রেনটির ভার সামলাতে পারেনি। তাতেই ঘটে দুর্ঘটনা বলে জানিয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খন্দকার শহীদুল ইসলাম।
বুধবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনার পরে রাতেই গাফিলতি কারণ দেখিয়ে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে প্রকৌশল বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রশিদকে। ঘটনা তদন্তে বিভাগীয় ট্রান্সপোর্ট অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। সেই কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ জানিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এদিকে, ২৮ ঘন্টা পর রাজশাহীর সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০ টার দিকে সর্বশেষ বগিটি তুলে নিয়ে উদ্ধার অভিযোগ শেষ করে রেল কর্তৃপক্ষ। এর পর প্রায় পৌনে একঘন্টা মেরামতের কাজ করে লাইন ট্রেন চলার উপযোগি করা হয় বলে জানিয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান প্রকৌশলী আফজাল হোসেন।
তিনি বলেন, বৃষ্টি ও রাতের কারণে দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় পুরোপুরি লাইন মেরামত করা সম্ভাব হয়নি। শুক্রবার সকাল থেকে আবার মেরাতম কাজ শুরু হবে। এর আগ পর্যন্ত এ এলাকায় সর্বচ্চ ১০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী আরও বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া রাজশাহীগামী ট্রেন ছেড়েছে। আর রাজশাহীতে ঢাকার উদেশ্যে পদ্মা এক্সপ্রেস ছেড়ে যাবে রাত সাড়ে ১১টায় এবং ধুমকেতু এক্সপ্রেস রাত ২টায়। এই দুইটি ট্রেনের মধ্যে পদ্মা এক্সপ্রেসের রাজশাহী থেকে ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৪টায় এবং ধুমকেতু রাত ১১টা ২০ মিনিটে।
বুধবার ৬টার পর ট্রেনের ৮টি লরি লাইনচ্যুতি হওয়ার পরে সারা দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাগঞ্জের। দুর্ঘটনার পর রাজশাহী থেকে বিভিন্ন রুচে ১০টি আন্তনগরসহ সবগুলো লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিলো।
এদিকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবদুল করিম জানান, যেসব ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়েছে তার যাত্রীদের টিকিটের মূল্য ফেরত দেয়া হয়েছে। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত তারা প্রায় সাত হাজার যাত্রীকে ২৬ লাখ টাকারও বেশি ফেরত দিয়েছেন। তবে হাতে আর নগদ টাকা নেই। তাই টাকাও ফেরত দেয়া হচ্ছে না। যাত্রীদের পরে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।
রাত ১০টায় প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী অসীম কুমার তালুকদার জানান, ১০টার দিকে উদ্ধার কাজ শেষে হয়েছে। বিকেল চারটার পদ্মা ট্রেন ছেড়ে যাবে রাত সাড়ে ১১টার দিকে। আর রাত ১১টার ধুমকেতু ট্রেন ছেড়ে যাবে রাত দুইটার দিকে।
তিনি উদ্ধার কাজে বিলম্বের বিষয়ে জানান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার দলটিকে কাজে বেগ পেতে হয়েছে। তবে কারো কাজে কোন গাফিলতি ছিলো না। ঘটনাস্থলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আফজাল হোসেন, প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী অসীম কুমার তালুকদার, রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ট্রেনের বগি উদ্ধার এবং লাইন সংস্কারের কাজ সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খন্দকার শহীদুল ইসলাম দুর্ঘটনা বিষয়ে জানান, রেল লাইনের স্লিপারের সাথে সংযোগকারী লাইনে ক্লিপ (ডগ স্পাইক) লাগানই ছিলো না অনেক জায়গায়। লাইন সংস্কারের কাজ চলমান। সেই সঙ্গে বৃষ্টির কারণে দুর্বল ছিল লাইনের নিচের মাটি। ফলে দুর্বল সেই লাইন তেলবাহী ট্রেনটির ভার সামলাতে পারেনি।
এদিকে তদন্ত কমিটির আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন ভিন্ন কথা। দুর্ঘটনা এলাকায় রেল লাইনের ওপরে একটি রাস্তা রয়েছে (রেল ক্রসিং)। সেই রাস্তা নির্মাণে রেল লাইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যতার কারণে ঘটেছে এই দুর্ঘটনা। সেই সাথে বৃষ্টির কারণে লাইনের তলের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে এর সবই প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দুর্ঘটনা স্থলের ট্রেন লাইনে গিয়ে দেখা যায়, লাইনটিতে পর্যাপ্ত পাথর নেই। কাঠের স্লিপারগুলো পুরাতন ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। নতুন বসান হয়েছে স্টিলের স্লিপার। আগাছা মূল লাইনটিকে গ্রাস করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ট্রেন লাইনটি দুর্বল হবার কারণেই ঘটেছে এই দুর্ঘটনা। তাদের আরো অভিযোগ লাইনগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় না। যে এলাকায় ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে সেখানকার লাইন সংস্কারের কাজ চলছিল। পুরাতন স্লীপার পরিবর্তন করে নতুন স্লীপার বসানো হচ্ছিল। কিন্তু যারা সংস্কার কাজ করেছেন তারা স্লীপারের সঙ্গে লাইন আটকানো বেশকিছু ডগস্পাইক খুলে রাখা ছিল।

এর আগে, সর্বশেষ এবছরের ১১ মার্চ রাতে রাজবাড়ী থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীমুখি ‘মধুমতি এক্সপ্রেস’ নামের একটি ট্রেন রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে হরিয়ান স্টেশনের কাছে এসে হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়। এসময়ও রাজশাহীর সাথে সকল রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখনো দুর্ঘটান কবলীত লাইনে দেখা গেছে দুরাবস্থা। রেলের সাঁকোতে বাঁশের বাতা, লাইনে পাথর নেই। নেই স্লিপান, লাইন ও স্লিপার ধরে রাখা ডগ স্টাইক ছিলো না। আগাছায় মূল লাইনই দেখা যচ্ছিনো না।
রেল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, বুধবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনা কবলীত তেলবাহী ট্রেনটি ৩১টি লরি নিয়ে রাজশাহীর দিকে আসছিল। ট্রেনের প্রতিটি লরিতে ছিল ৫০ হাজার লিটার তেল। প্রতি বগির ওজন ৫০ টন। সৌভাগ্য বসত বগিগুলো লাইনচ্যুত হলেও উল্টে পড়েনি। এমনটি ঘটলে বিপত্তি আরো বড় আকার ধারণ করতো।

কোন মন্তব্য নেই