নিউজ ফাস্ট

আমফানের গতি কিছুটা কমেছে

















প্রবল ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় আমফানের গতি কিছুটা কমে গেছে। তবে এখনো যে গতিতে এগিয়ে আসছে তাতে এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা মোটেও কমেনি। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় আমফানের কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার। এটা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল কিন্তু বেলা ৩টায় ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। গতি যাই হোক এটা আজ বুধবার বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বিকেল অথবা সন্ধ্যার মধ্যে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ আমফান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৩০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল।

এ দিকে কানাডা থেকে আবহাওয়া গবেষক মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, শক্তি উল্লেখযোগ্য হারে কমে আমফান ক্যাটেগরি ৩ মানের ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। এর কেন্দ্রে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ২০৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসারে আমফানের কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হতে পারে।
স্থলভাগে প্রবেশের সময় আমফানের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ আরো কমে ক্যাটেগরি ২ মানের ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত করবে বলে পূর্বাভাস মডেল নির্দেশ করছে। তখন হয়তো কেন্দ্রে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৭০ কিলোমিটার থাকবে। আমফান যখন রাজশাহী জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হবে তখন এটি ক্যাটেগরি ১ মানের ঘূর্ণিঝড় হিসেবে থাকবে। তখন ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার থাকবে বলে আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল নির্দেশ করছে।

মংলা-পায়রায় ৭, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সঙ্কেত : মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ (সাত) নম্বর বিপদ সঙ্কেতে দেখিেেয় যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগরেহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেতের আওতায় থাকবে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ (ছয়) নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তাদরে অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৬ (ছয়) নম্বর বিপদ সঙ্কেতের আওতায় থাকবে।
জলোচ্ছ্বাসের সতর্কতা : ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নি¤œাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ১০ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা : ঘূর্ণিঝড় অতিক্রম কালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর উপর থেকে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
জেলেদের জন্য সতর্কতা : উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা, মধ্যরাতের পর থেকে বৃহত্তর ফরিদপুর-মাদারীপুর জেলা এবং আজ ভোর হতে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে বৃষ্টি শুরু হতে পারে এবং তা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সারা দেশে বৃষ্টিপাত হবে। তবে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজারে সাগর উত্তাল : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সেনা ও ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত
কক্সবাজার (দক্ষিণ) সংবাদদাতা জানান, উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় আমফান। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর। আমফানের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। আমফানে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সাগরে অবস্থানরত ফিশিং ট্রলারগুলো উপকূলে ফিরে আসতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চালু করা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। সিপিপির ভলান্টিয়ার, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বেচ্ছাসেবকরা প্রস্তুত রয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থার পাশাপাশি সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
উপকূলের মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৫৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি উপকূলের স্কুল-কলেজ। সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় ওষুধসহ মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে প্রয়োজনীয় যানবাহন। অপর দিকে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১০ হাজার ভলান্টিয়ার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দুর্যোগ মোকাবেলার লক্ষ্যে সেনাবাহিনী ও ভলান্টিয়ারদের যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।








পটুয়াখালীতে গুমট আবহাওয়া, সাগর উত্তাল, আতঙ্ক
পটুয়াখালী সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় আমফানের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে গুমট আবহাওয়া, ভাপসা গরম ও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি না হওয়া ও গুমট আবহাওয়া ঘূর্ণিঝড়কে আরো শক্তিশালী করে নিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এর ফলে ক্রমেই কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরা ট্রলারগুলো নিরাপদে আসতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে আবহাওয়া অধিদফতর সঙ্কেত বাড়িয়ে দিয়েছেন। পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৭ নম্বর বিপদসঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানান, প্রত্যেককে সর্তক অবস্থান গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে। যার টেলিফোন নম্বর ০৪৪১-৬৫০১০ এবং মোবাইল নম্বর ০১৭১০২৯৮৭১৮। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ২০ লাখ নগদ টাকা, ৯ লাখ শিশুখাদ্য, ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে।








সাতক্ষীরার উপকূলীয় লোকদের আনা হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রে
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরায় আমফান মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে তিন হাজারেরও অধিক ব্যক্তিকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার কথা রয়েছে। এ দিকে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। এ দিকে ঘূর্ণিঝড় আমফান মোকাবেলায় জেলায় মোট ১৪৫টি বন্যা/ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসহ এক হাজার ৭০০ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নৈশপ্রহরীকে সার্বক্ষণিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানসহ মোবাইল সচল রাখতে বলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করবেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, সাতক্ষীরার অফিস কক্ষে জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। (কালেক্টরেট ভবন, কক্ষ নম্বর ২২৪, টেলিফোন নম্বর ০৪৭১-৬৩২৮১)।
বরগুনায় বাড়ানো হয়েছে সাইক্লোন শেল্টার
বরগুনা সংবাদদাতা জানান, করোনার কারণে ঘূর্ণিঝড় আমফান সামলাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে বরগুনা জেলা প্রশাসনকে। বিশেষ করে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে জেলায় বাড়ানো হচ্ছে দেড় শতাধিক নতুন আশ্রয়কেন্দ্র। এ ছাড়াও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ইতোমধ্যেই জেলার ছয় উপজেলায় ২৫ লাখ টাকা ও ২০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরগুনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় একযোগে জেলার ছয়টি উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

তালতলী উপকূলের ৫০ হাজার মানুষ আমলেই নিচ্ছে না
আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, আমফান প্রবল বেগে ধেয়ে এলেও তালতলী উপকূলের সাগর ও পায়রা নদী সংলগ্ন অঞ্চলের ৫০ হাজার মানুষ ঘূর্ণিঝড় আমফান আমলেই নিচ্ছে না। তাদের মাঝে বন্যার কোনো আতঙ্ক নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মঙ্গলবার মাইকিং ও স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করলেও তারা তা শুনছে না। তাদের দ্রুত সরিয়ে না নিলে সাইক্লোন সিডরের পুনাবৃত্তি ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। মঙ্গলবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তালতলী উপজেলার সাগর ও পায়রা নদীসংলগ্ন পচাকোড়ালিয়া, ছোটবগী, মৌপাড়া, গাবতলী, চরপাড়া, তালতলী, খোট্টারচর, তেঁতুলবাড়িয়া, জয়ালভাঙ্গা, নলবুনিয়া, ফকিরহাট, নিদ্রাসকিনা ও আমখোলাসহ উপকূলের অধিকাংশ এলাকায় মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে অবস্থান করছে।








মির্জাগঞ্জে ৫৭ সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত
মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ৫৭টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রেখেছে উপজেলা প্রশাসন। সিডর বিধ্বস্ত মির্জাগঞ্জের মেন্দিয়াবাদ থেকে চরখালী হাইস্কুল পর্যন্ত শক্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বাঁধের ওপর বসবাসকারী মানুষজন আতঙ্কে আছেন কখন ধেয়ে আসে ঘূর্ণিঝড় আমফান। তবে উপজেলা প্রশাসন থেকে সতর্কমূলক মাইকিং করা হচ্ছে প্রতিটি ইউনিয়নে।


No comments