সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার আমানত জমা আছে ব্যাংকে
সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ জমা রাখা হয় ব্যাংকে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ১২০ কোটি টাকা। দেশের তফসিলভুক্ত ৫৭টি সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকে এ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। সরকারি আমানতের প্রায় ৬৯ শতাংশই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় জমা আছে সরকারি আমানতের ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত সরাসরি সরকারের কোষাগারে জমা রাখার বিষয়ে গত বছরের শুরুতে আইন পাস করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, আইনটি পাস হওয়ার পর ব্যাংকগুলোতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ৫২ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ২০১৯ সালের জুনে দেশের ব্যাংকগুলোতে ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা আমানত হিসেবে ছিল। সরকারি আমানতের বড় অংশই জমা আছে রাজধানীর ব্যাংক শাখাগুলোতে। ঢাকায় ব্যাংক শাখাগুলোতে সরকারি আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। আর ঢাকার বাইরে সারা দেশে ব্যাংকের শাখাগুলোতে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকার সরকারি আমানত জমা আছে।
২০১৮ সালে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ছিল আমানতের তীব্র সংকট। তখন বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের দাবির মুখে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছিল। এর আগে সরকারি আমানতের ২৫ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বিধান ছিল। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ মুহূর্তে সরকারি আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতা থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরে এসেছে। মে পর্যন্ত মোট সরকারি আমানতের ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ জমা ছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে। তবে নতুন প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ক্রমেই বাড়ছে।
দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে বিপদে পড়তে হয়েছিল অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে। তার পরও এসব ব্যাংকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ক্রমেই বাড়ছে। ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া নয়টি বেসরকারি ব্যাংকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। অথচ মে মাস শেষে এর পরিমাণ ১৬ হাজার ১২০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সরকারি আমানত রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ব্যাংকারদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ব্যাংকে আমানত রাখেন। এক্ষেত্রে সুদের হার বেশি আছে কিনা এ বিষয়ই তারা প্রাথমিকভাবে দেখে থাকে। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা কেমন সেটি আমলে নেয়া হয় না। কিছু দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনেক বেশি সরকারি আমানত রেখে সংশ্লিষ্টদের বিপদে পড়তে দেখেছি। যথাসময়ে সরকারি আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকের বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।
যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, আমানত রাখার ক্ষেত্রে সেসব ব্যাংক পরিহারের বিষয়ে সরকার থেকে নির্দেশনা থাকা দরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে শেষে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার আমানত জমা ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৯টি ব্যাংকে, যা মোট সরকারি আমানতের ৬৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে জমা ছিল ৭৮ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার সরকারি আমানত। এ হিসাবে সরকারি আমানতের ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে জমা ছিল। দেশে কার্যরত বিদেশী ব্যাংকগুলোতে সরকারি আমানত জমা আছে ৫ হাজার ৫৬ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি আমানতের ২ শতাংশেরও কম।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা আছে জনতা ব্যাংকে। মে শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটিতে জমাকৃত আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪ হাজার ২২ কোটি টাকা জমা আছে সোনালী ব্যাংকে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে ৩৬ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা ও রূপালী ব্যাংকে ২৭ হাজার ১০৬ কোটি, বেসিক ব্যাংকে ১১ হাজার ৩৩১ কোটি ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ১৩ হাজার ২০২ কোটি টাকার সরকারি আমানত জমা আছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরকারি আমানত জমা আছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। মে মাস শেষে ব্যাংকটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত আমানতের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকার সরকারি আমানত জমা ছিল এবি ব্যাংকে। এছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকে ৪ হাজার ৬৭৩ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ৪ হাজার ১২৭ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৩ হাজার ৯৬৮ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকে ৩ হাজার ৭৪৩ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকে ৩ হাজার ৬১৪ কোটি, ওয়ান ব্যাংকে ৩ হাজার ৯৪ কোটি টাকার সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত জমা আছে।
২ লাখ ৬৪ হাজার ১২০ কোটি টাকার সরকারি আমানতের মধ্যে ২৮ হাজার ৫৭২ কোটি হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ৫২ হাজার ৮৬২ কোটি, পাবলিক অনার্থিক সংস্থার ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯৬ কোটি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ৮ হাজার ৯৬৮ কোটি, আমানত গ্রহণকারী পাবলিক নন-ব্যাংক সংস্থার ৩ হাজার ৯০ কোটি, অন্যান্য পাবলিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (ডিপোজিট মানি ব্যাংক ব্যতীত) ৭ হাজার ২৮ কোটি, পাবলিক বীমা কোম্পানি ও পেনশন ফান্ডের ৯ হাজার ১ কোটি টাকা।
‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন-২০২০’ পাস করে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত টাকা রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারি কোষাগারে জমা নিচ্ছে সরকার। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত এ বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে মোট ৩৯ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা অর্থ জমা দিয়েছে।
জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৮ হাজার কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে। অর্থবছরের বাকি সময়ে আরো আসবে।

কোন মন্তব্য নেই