সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম কানুন
![]() |
| সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম কানুন |
প্রতিটি
আত্মীয়তার সম্পর্কই সুন্দর ও মধুর। তবে মাঝেমধ্যে এই সুন্দর সম্পর্কেও ফাটল দেখা
দেয়। বিশেষ করে বাবা, মা ও আত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে প্রায়ই অন্য
আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যাও নেহাত কম
নয়। বাংলাদেশে মুসলিম আইন অনুযায়ী কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার ওপর ভিত্তি করে আত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টনের
সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। এসব আইন কী বলে
আসুন জেনে নিই।
| সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম কানুন |
সম্পত্তির
অংশীদারগণ (Sharers):
বাংলাদেশে মুসলিম
আইন অনুযায়ী সম্পত্তির প্রধান অংশীদারদের সংখ্যা ১২ জন; এরা বিবাহ সিদ্ব জাত এবং রক্ত সম্পর্কীয়
আত্মীয়। তার মধ্যে চারজন পুরুষ এবং আটজন মহিলা। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টনের
ক্ষেত্রে অন্য সব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে অগ্রাধিকার পান এবং তাদের অংশ রেখে পরে অন্যান্যদেরকে
সম্পত্তি প্রদান করা হয়।
পুরুষ চার জন
হলো:
১) পিতা ২) দাদা
বা তদুর্ধ ৩) স্বামী ৪) বৈপিত্রেয় ভাই
মহিলা আটজন হলো:
১) স্ত্রী ২)
মাতা ৩) কন্যা ৪) সহোদরা বোন ৫) বৈমাত্রেয়া বোন ৬) বৈপিত্রেয়া বোন ৭) কন্যা ও ৮)
দাদী তাদের মধ্যে পিতা, স্বামী, মাতা, কন্যা ও স্ত্রী এই পাঁচজন কখনো উত্তরাধিকার থেকে কখনো বঞ্চিত হয়না। তাই
তাদেরকে প্রতক্ষ্য অংশীদার বলা হয় এবং বাকীদেরকে পরোক্ষ অংশীদার বলা হয়। কারণ
তারা কোন কোন ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হয়।
সম্পত্তির
অবশিষ্টাংশের অন্যান্য অংশীদারগন
মৃত ব্যক্তির যাদের
সাথে রক্তের সম্পর্ক আছে এবং যারা অংশীদারদের নির্দিষ্ট অংশ নেবার পর কোন সম্পত্তি
অবশিষ্ট থাকলে তা অথবা কোন অংশীদার না থাকলে সমস্ত সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির সাথে
রক্তের সম্পর্ক আছে এমন সমস্ত নিকটবর্তী আত্নীয়রা তালিকায় উল্লেখিত ক্রমানুসারে
লাভ করে থাকে। মৃত ব্যক্তির এ সকল নিকটত্নীয়দেরকে অবশিষ্টাংশভোগী বলা হয়। এই
অবশিষ্টংশ ভোগীদের কোন নির্দিষ্ট অংশ নাই। অংশীদারদের দেওয়ার পরেই কেবল অবশিষ্ট
সম্পত্তি তারা পাবেন, কিন্তু এই
অবশিষ্টাংশের পরিমাণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হতে পারে। যদি কোন অংশীদার না
থাকেন, তবে সমস্ত
সম্পত্তিই আসাবা বা অংশীদারগণ পাবেন। এ সকল আসাবা বা অবশিষ্টাংশ ভোগীগণকে এগনেটিক
ওয়ারিশ ও বলা হয়। কারণ এরা পুরুষ আত্নীয়ের মাধ্যমেই ওয়ারিশ হয়ে থাকে।
মুসলিম আইনে মৃত
ব্যক্তির সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারীরা কে কিভাবে পাবেন??
একজন মুসলমান যদি
মারা যায় তবে তাঁর সম্পত্তি বন্টনের আগে কিছু বিষয়ে তাঁর আত্মীয় স্বজনদের বিশেষ
মনোযোগ রাখতে হয় এবং ঐ সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই কেবল মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ভাগ
বাটোয়ারা করা যাবে।
একজন মুসলমানের
মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি ভাগের আগে যা করনীয়ঃ
১) যদি মৃত
ব্যক্তির পর্যাপ্ত সম্পত্তি থাকে তবে তাঁর সম্পত্তি থেকে তাঁর দাফন কাফনের
ব্যবস্থা করা।
২) মৃত ব্যক্তির
কোন প্রকারের ঋণ কিংবা ধার দেনা থাকলে তা ঐ ব্যক্তির সম্পদ থেকে পরিশোধ করারম
ব্যবস্থা করা।
৩) মৃত ব্যক্তির
স্ত্রীর দেনমোহোর পরিশোধ হয়েছে কিনা দেখা যদি না হয়ে থাকে তা পরিশোধ করা।
৪) মৃত ব্যক্তি
যদি কোন হেবা বা দান কিংবা অসিয়ত করে যান তবে উল্লেখিত সম্পত্তি দান করে দেয়া।
এবার যদি উপরের কাজ সমূহ করার পরে মৃত ব্যক্তির কোন সম্পদ-সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে
তবে অবশিষ্ট সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারীদের মাঝে বন্টন করতে হবে। তবে বন্টনের
ক্ষেত্রে মুসলিম আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ আছে।
মৃত ব্যক্তির
সম্পত্তির উপর তাঁর উত্তরাধিকারীরা কে কি পরিমাণ অংশ পাবেনঃ
স্বামী:-
স্বামী দুই ভাবে
স্ত্রীর উপরে সম্পত্তি পাবে, যদি মৃত ব্যক্তির
সন্তান-সন্ততি থাকে তবে স্বামী পাবে এক চতুর্থাংশ। যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান-সন্ততি
না থাকে তবে স্বামী পাবে অর্ধেক সম্পত্তি।
স্ত্রীঃ
মৃত ব্যক্তির
স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি দুইভাবে পাবেন-যদি মৃত ব্যক্তির এবং তাঁর স্ত্রীর সন্তান
বা পুত্রের সন্তান থাকে তবে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ (১/৮)
পাবেন।
যদি মৃত ব্যক্তি
এবং তাঁর স্ত্রীর সংসারে কোন সন্তান না থাকে তাহলে স্ত্রী মোট সম্পত্তির চার ভাগের
এক ভাগ (১/৪) পাবেন।
পুত্রঃ
ছেলেরা মৃতের
উপরে সকল ক্ষেত্রেই সম্পত্তি পেয়ে থাকে, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির ক্ষেত্রে সকলের অংশ ভাগের পর অবশিষ্ট সকল অংশ ছেলে এবং
মেয়ে পাবে।
তবে এই ক্ষেত্রে
ছেলে সম্পদে যে পরিমাণ অংশ পায় মেয়েরা সম্পদের উপরে ছেলের অর্ধেক পরিমাণ পাবে। যদি
মেয়ে না থাকে তবে বাকী সম্পূর্ণ অংশ ছেলে পাবে।
মেয়েঃ
মুসলিম সম্পত্তি
আইন অনুযায়ী একজন মেয়ে ৩ নিয়মে মৃতের সম্পদ পেয়ে থাকে। যদি একজন মেয়ে হয় তবে
দুইভাগের একভাগ (১/২) পাবে। যদি একাধিক মেয়ে হয় তবে সবাইকে তিন ভাগের দুই ভাগ
(২/৩) দেয়া হবে। যদি মৃত ব্যক্তির ছেলে মেয়ে উভয়েই থাকে তবে ছেলে যে পরিমাণ পাবে
মেয়ে তাঁর অর্ধেক পাবে।
বাবাঃ
মৃত ব্যক্তির
সম্পত্তি উপর তাঁর বাবা ৩ প্রকারে সম্পত্তি পাবেন, যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র, পুত্রের পুত্র কিংবা আরও নিচে পুত্রের পুত্রের
পুত্র যত নিচেই হোক না কেন থাকে তবে মৃত ব্যক্তির পিতা পাবেন সম্পত্তি ছয় ভাগের এক
ভাগ (১/৬)।
যদি মৃত ব্যক্তির
কোন পুত্র কিংবা নিন্মগামী পুত্র না থাকে কেবল কন্যা থাকে তবে ছয় ভাগের এক ভাগ
(১/৬) পাবেন এবং কন্যাদের ও অন্যান্যদের দেয়ার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে তাও
পাবেন।
যদি মৃত ব্যক্তির
কোন সন্তান না থাকে তবে বাদ বাকী অংশীদারদের দেয়ার পর সকল সম্পত্তি বাবা পাবেন।
মৃত ব্যক্তির কোন সন্তান না থাকলে যদি বাবাও না থাকে তবে তাঁর জীবিত ভাই পাবে,
ভাই না থাকলে ভাইয়ের
সন্তান পাবে।
মাতাঃ
মৃত ব্যক্তির মা
তিন ভাবে সম্পত্তি পাবেন, যদি মৃত ব্যক্তির
কোন সন্তান বা পুত্রের সন্তানাদি, যত নিম্নেরই হউক,
থাকলে অথবা যদি পূর্ণ,
বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয়
ভাই বা বোন থাকে তবে মাতা ছয় ভাগের এক ভাগ (১/৬) পাবেন।
যদি মৃত ব্যক্তির
কোন সন্তান বা পুত্রের সন্তানাদি, যত নিম্নের হউক
না থাকে এবং যদি একজনের বেশি ভাই বা বোন না থাকে তবে মাতা তিন ভাগের এক ভাগ (১/৩)
পাবেন।
যদি মৃত ব্যক্তির
কোন সন্তান বা পুত্রের সন্তানাদি, যত নিম্নের হউক
না থাকে অথবা কমপক্ষে দুইজন ভাইবোন না থাকে এবং যদি মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী
অংশ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তার তিন ভাগের এক ভাগ (১/৩) মাতা পাবেন।
মুসলিম আইনের
কিছু সাধারণ বিষয়
অনেকেই ভাবেন
পিতার সম্পত্তি সন্তানকে বঞ্চিত করতে ত্যাজ্য করা যায় অর্থাৎ ত্যাজ্য করলে সন্তান
সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে, কিন্তু বিষয়টি
ঠিক নয় কেউ চাইলে কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে ত্যাজ্য করতে পারবেনা।
অনেক ক্ষেত্রে সৎ
ছেলে মেয়ের বিষয়টি আসে, কিন্তু ইসলামে
পরিষ্কার বলা আছে সৎ ছেলে মেয়ে কখনোই সৎ বাবা মায়ের সম্পত্তির অংশীদার হবেনা একই
সাথে সৎ বাবা মাও সৎ ছেলে মেয়ের সম্পত্তির অংশীদার হবেনা।
ইসলামিক সরিয়া
আইনে বলা আছে যদি পিতা বেঁচে থাকতে কোন বিবাহিত সন্তান স্ত্রী এবং সন্তান রেখে
মারা যায় তবে ঐ পিতার মৃত্যুর পর পিতার বর্তমানে মৃত সন্তান কোন সম্পত্তি পাবেনা,
কিন্তু ১৯৬১ সালের মুসলিম
পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে উত্তরাধিকার সংক্রান- বিধান সংশোধন করে মৃত ব্যক্তির
সম্পত্তি বিবাহিত মৃত পুত্রের ওয়ারিশরা অংশ পাবে এই বিধান সংযুক্ত করা হয়।
#মোঃ রায়হান চৌধুরী
তথ্য সূত্র:
ইন্টারনেট।

কোন মন্তব্য নেই