ক্লান্ত শহরের জীবন্ত রোবট: ঢাকার নিয়ন আলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নীরব কান্নার গল্প
[ফিচার ডেক্স — Times Express 24] বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবকিছুই ঠিকঠাক, একদম স্বাভাবিক। রাজপথে তীব্র যানজট, চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা আড্ডা, শপিং মলে তরুণ-তরুণীদের সেলফি তোলার ধুম কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় চেক-ইন আর হাসিমুখের স্টোরির মেলা। মেগাসিটি ঢাকার প্রতিদিনের চেনা ছবি এটি। কিন্তু এই চিরব্যস্ত, নিয়ন আলোয় মোড়ানো শহরের জমকালো আবরণের ঠিক নিচেই বাস করে এক অন্য ঢাকা। যেখানে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ নীরবে, একাকী ভেঙে পড়ছে। বাইরে ফিটফাট, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটু একটু করে ক্লান্ত ও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে এই শহরের একটা বড় অংশ।
ঢাকা শহরের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপটি সম্ভবত এটাই—এখানে মানুষ বড় অদ্ভুতভাবে চুপচাপ কাঁদতে শিখে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে কর্পোরেট পাড়া: এক অদৃশ্য যুদ্ধ ঢাকার যেকোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে প্রাণোচ্ছ্বল একদল তরুণ-তরুণীকে। কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই তাদের চোখের কোণে ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের কাঁধে আজ পাহাড়সম বোঝা—মধ্যবিত্ত পরিবারের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, ক্যারিয়ার গড়ার তীব্র লড়াই, রিলেশনশিপের টানাপোড়েন আর সমাজে নিজেকে প্রমাণ করার এক অন্তহীন যুদ্ধ। এই সব চাপ বুক পকেটে নিয়ে তারা প্রতিদিন হাসিমুখে ক্লাসে যাচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিচ্ছে, কিন্তু মনের ভেতরের ভয়টা কাউকেই বলতে পারছে না।
ক্যাম্পাস পেরিয়ে যখন আপনি মতিঝিল, গুলশান কিংবা বনানীর মতো কর্পোরেট এলাকায় যাবেন, তখন দৃশ্যপট কিছুটা বদলায়। সেখানে দেখা মিলবে পরিপাটি শার্ট-প্যান্ট পরা, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে হেঁটে চলা হাজারো ‘সফল’ চাকুরিজীবীর। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এরা জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। কিন্তু বাস্তবতার দেয়ালটা এখানে আরও নির্মম। এদের অনেকেই আজ এমন এক যান্ত্রিক ইঁদুর-দৌড়ে আটকে গেছে, যা তারা নিজেরাও পছন্দ করে না। টার্গেট পূরণ, বসের ঝাড়ি, আর মাসের শেষে ইঁট-পাথরের এই শহরে টিকে থাকার খরচের হিসাব মেলাতে মেলাতে তারা নিজেদের অজান্তেই পরিণত হচ্ছে এক একটি জীবন্ত রোবটে।
কোলাহলের মাঝেও তীব্র একাকীত্ব উইকেন্ড বা ছুটির দিনগুলোতে ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে এই শহরে কোনো দুঃখ নেই। চারদিকে আলোর রোশনাই, সুস্বাদু খাবার আর আড্ডার শব্দ। ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে আপলোড হচ্ছে হাসিমুখের নিখুঁত সব ছবি। কিন্তু সাইকোলজিস্ট বা সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই অতি-যোগাযোগের যুগেও মানুষ আজ সবচেয়ে বেশি একাকী। চারপাশে শত শত মানুষের ভিড়, ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হাজারো ‘ফ্রেন্ড’ থাকার পরও দিনশেষে কথা বলার মতো, মনের ক্ষতগুলো শেয়ার করার মতো একজন মানুষের বড় অভাব এই শহরে।
থামে না এই শহর, চেনে না কোনো আবেগ ঢাকার নির্মম সত্যটি হলো—এই শহর কারো জন্য থামে না। আপনি মানসিকভাবে যতই ভেঙে পড়ুন না কেন, আপনার ব্যক্তিগত জীবন যতই বিপর্যস্ত হোক না কেন, পরদিন সকালে ঠিকই রাস্তায় চিরচেনা জ্যাম হবে। ঘড়ির কাঁটা ধরে আপনাকে অফিসে বা ক্লাসে ছুটতেই হবে। এই শহর কান্নার সময় দেয় না, থমকে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয় না। আর ঠিক এই কারণেই, হয়তো এই শহরের সবচেয়ে বিরল বা ‘রেয়ার’ জিনিসটি হলো—কারো একটুখানি নিঃস্বার্থ সহানুভূতি এবং ‘আমি আছি তো’ বলে পিঠে হাত রাখার মতো একটা বিশ্বস্ত মানুষ।
ইঁট-কাঠ-পাথরের এই মেগাসিটিতে আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের চারপাশের চেনা হাসিমুখগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা নীরব ক্লান্তিকে বোঝার চেষ্টা করা। কারণ, দিনশেষে একটি শহরের সার্থকতা তার বড় বড় ফ্লাইওভার বা বহুতল ভবনে নয়, বরং তার ভেতরে বাস করা মানুষগুলোর মানসিক সুস্থতা আর হাসিমুখের মাঝে লুকিয়ে থাকে।
(সমাজ, জীবন ও সমসাময়িক মানুষের ভেতরের না বলা সব গল্পের নিয়মিত আপডেট পেতে চোখ রাখুন Times Express 24-এর পাতায়। আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে নিচে কমেন্ট করুন।)

কোন মন্তব্য নেই