১২ বছরের অপেক্ষার অবসান, চীন-উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | Times Express 24
দীর্ঘ ১২ বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে চালু হয়েছে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সংযুক্ত করা নতুন সড়ক সেতু। গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো চালুর মধ্য দিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঘটনাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, চালু হওয়া ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুর সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও সীমান্ত যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু?
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনের অবস্থান বজায় রয়েছে।
নতুন সেতুটি চালুর ফলে সীমান্তবর্তী দুই অঞ্চলের মধ্যে সড়ক যোগাযোগের সুযোগ বাড়বে। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য যোগাযোগ কার্যক্রমেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এত দিন দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পুরোনো চীন-উত্তর কোরিয়া মৈত্রী সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। নতুন সেতুটি সেই যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে এবং বাণিজ্যিক পরিবহনে অতিরিক্ত সক্ষমতা যোগ করতে পারে।
তবে সেতু চালু হওয়া মানেই বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সীমান্তনীতি, শুল্কব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলোও বাণিজ্যের গতি নির্ধারণ করবে।
২০১৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল প্রকল্প
নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল আরও এক দশকের বেশি সময় আগে। ২০১৪ সালে এটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এরপর উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্ক অবকাঠামোর কাজ থেমে যাওয়ায় পুরো প্রকল্প দীর্ঘ সময় ধরে অচল অবস্থায় ছিল।
একটি অবকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণ শেষ হলেও দুই দেশের সমন্বয় ছাড়া সেটি কার্যকর করা সম্ভব নয়—এই দীর্ঘ বিলম্ব তারই উদাহরণ। অবশেষে সেতুটি চালু হওয়ায় সীমান্ত যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
চীনের পক্ষ থেকে সেতুটিকে দুই দেশের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বেইজিংয়ের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে বাণিজ্য ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও জোরদার হবে।
চীন-উত্তর কোরিয়া বাণিজ্যে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সীমিত বাণিজ্যিক সুযোগের চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৭০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল। এর বড় অংশই ছিল উত্তর কোরিয়ায় চীনের পণ্য রপ্তানি।
নতুন সেতুর মাধ্যমে পরিবহনব্যবস্থা আরও কার্যকর হলে পণ্য চলাচলে সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে বাণিজ্য কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের ওপর।
উত্তর কোরিয়ার জন্য চীনা পণ্যের সরবরাহ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজস্ব বাজার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাও দেশটির নেতৃত্বের অগ্রাধিকার। ফলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ং সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।
পুরোনো বন্ধুত্বে নতুন গতি
চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে এবং তাদের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তিও বিদ্যমান।
তবে সম্পর্ক সব সময় একই রকম ছিল না। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে একসময় বেইজিংয়ের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল। এসব কারণে দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলে। সীমান্ত যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করা এবং নতুন অবকাঠামো চালুর মতো পদক্ষেপকে সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে একটি সেতু চালুর ঘটনাকে দুই দেশের সব মতপার্থক্য দূর হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর একটি বাস্তব পদক্ষেপ।
রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতাও গুরুত্বপূর্ণ
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের জন্যও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রভাব বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সেতু এবং পুনরায় সক্রিয় হওয়া পরিবহন যোগাযোগ বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ককে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এই অবকাঠামো প্রকল্পকে শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। সীমান্তবর্তী মানুষের যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে সেতুটি?
নতুন সেতু চালু হওয়া চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাস্তব সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব নির্ভর করবে দুই দেশ কীভাবে এটি ব্যবহার করে এবং সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে তার ওপর।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনায় নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে নতুন সেতু থাকলেও সব ধরনের পণ্য ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যাবে না।
অন্যদিকে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১২ বছরের অপেক্ষার পর নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ চালু হওয়া চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি একদিকে সীমান্ত যোগাযোগ ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বও সামনে আনছে।
প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক ডেস্ক, Times Express 24

কোন মন্তব্য নেই