দেশে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে ওয়ালটন ও প্রাণ–আরএফএল, বাড়বে বিনিয়োগ - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

দেশে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে ওয়ালটন ও প্রাণ–আরএফএল, বাড়বে বিনিয়োগ

 

টাইমস এক্সপ্রেস ২৪ | শিল্প ও বাণিজ্য

দেশে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির বাজার ধরতে উৎপাদনে নামছে দেশের দুই বড় শিল্পগোষ্ঠী ওয়ালটন ও প্রাণ–আরএফএল। বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণের চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ খাতে বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওয়ালটন গাজীপুরের চন্দ্রায় নিজস্ব কারখানায় ব্যাটারির সেল উৎপাদন শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছে। অন্যদিকে, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ হবিগঞ্জের শিল্পপার্কে আমদানি করা সেল ব্যবহার করে ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে সব ধরনের ব্যাটারির বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির বাজার আনুমানিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এ বাজারের বড় অংশ লেড–অ্যাসিড ব্যাটারির দখলে থাকলেও বৈদ্যুতিক যানবাহন ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির চাহিদা বাড়ছে।

ওয়ালটনের কারখানায় বছরে উৎপাদন হবে এক কোটি সেল

ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ গাজীপুরের চন্দ্রায় লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির সেল উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ কারখানায় বছরে প্রায় এক কোটি ব্যাটারি সেল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে ১১৩ কোটি টাকা।

প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেল, খেলনা, রিচার্জেবল লাইট, রিচার্জেবল ফ্যান ও ডিজিটাল স্কেলের মতো পণ্যে ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি সেল তৈরি করা হবে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদনযন্ত্র স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে এবং পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি বড় আকারের লিথিয়াম ও সোডিয়াম ব্যাটারির সেল এবং ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ভবিষ্যতে ইজিবাইক, মিশুক, টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যাকআপ বিদ্যুৎব্যবস্থা, আইপিএস, ইউপিএস, সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও শিল্পকারখানার বিভিন্ন প্রয়োজনে এসব ব্যাটারি সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এ সম্প্রসারণে আরও ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

হবিগঞ্জে ব্যাটারি প্যাক তৈরি করবে প্রাণ–আরএফএল

প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ হবিগঞ্জে নিজেদের শিল্পপার্কে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি প্যাক তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে। এ প্রকল্পে ইতিমধ্যে ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। কারখানাটিতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুরুতে বিদেশ থেকে ব্যাটারির সেল, বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য উপকরণ আমদানি করে ব্যাটারি প্যাক তৈরি করা হবে। এ পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদনসুবিধা সম্প্রসারণ করে তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ইজিবাইক, মিশুক ও বৈদ্যুতিক দুই চাকার যানবাহনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারি তৈরি করা হবে। গ্রুপটির নিজস্ব ব্র্যান্ড ব্লেইজের অধীনে এসব পণ্য বাজারজাত করার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া সৌরবিদ্যুতের শক্তি সংরক্ষণ, আইপিএস ও ইউপিএস, টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ এবং শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থার জন্য ব্যাটারি উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। কারখানা সম্প্রসারণে আগামী বছর আরও ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, কারখানাটিতে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও ৫০০ জনের কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট বা এলএফপি প্রযুক্তির ব্যাটারি রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে।

ব্যাটারির বাজারে কেন বাড়ছে আগ্রহ

ব্যাটারিচালিত রিকশা, বৈদ্যুতিক বাইক এবং বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ায় এ খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারির বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বছরে বৈদ্যুতিক দুই চাকার যানবাহন বিক্রির সংখ্যা আনুমানিক ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার। এ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারির বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৬৭৫ কোটি থেকে ৯০০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারির বাজারমূল্য বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব খাতকে সামনে রেখেই দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির সুবিধা ও খরচ

প্রচলিত লেড–অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি সাধারণত হালকা, দ্রুত চার্জযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তবে ব্যাটারির ধরন, সক্ষমতা ও মানভেদে দাম এবং কার্যকারিতায় পার্থক্য থাকে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশায় সাধারণত চার থেকে পাঁচটি লেড–অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মোট দাম প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং ওজন প্রায় ১৬০ কেজি হতে পারে। পূর্ণ চার্জ হতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা।

অন্যদিকে, একই ধরনের রিকশার জন্য উপযোগী একটি লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির দাম আনুমানিক ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হতে পারে। এর ওজন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কেজি এবং চার্জ হতে সময় লাগতে পারে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। ব্যাটারির সক্ষমতা ও যানবাহনের অবস্থাভেদে একবার পূর্ণ চার্জে চলার দূরত্বও ভিন্ন হতে পারে।

অর্থাৎ, লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির প্রাথমিক ক্রয়মূল্য বেশি হলেও ওজন কম, চার্জের সময় কম এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকায় অনেক ব্যবহারকারীর কাছে এটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠছে।

স্থানীয় উৎপাদনে দাম কমার সম্ভাবনা

দেশে ব্যাটারি প্যাক উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৈরি লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি আমদানিতে শুল্ক ও করের মোট হার প্রায় ৬৪ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে, দেশে ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৮ শতাংশ বলে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রকৃত শুল্ক-কর পণ্যের ধরন, শ্রেণিবিন্যাস ও প্রযোজ্য নীতিমালার ওপর নির্ভর করে।

দেশে সেল উৎপাদন, ব্যাটারি প্যাক সংযোজন এবং যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা বাড়লে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। তবে উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা, প্রযুক্তির মান, নিরাপত্তা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করবে ভোক্তারা শেষ পর্যন্ত কতটা সাশ্রয়ী দামে ব্যাটারি পাবেন।

ওয়ালটন ও প্রাণ–আরএফএলের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ব্যাটারি শিল্পে স্থানীয় উৎপাদনের পরিধি বাড়তে পারে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ খাত দেশের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই