কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অনীহা কেন, ইসলাম কী শিক্ষা দেয়
টাইমস এক্সপ্রেস ২৪ | ধর্ম ও জীবন
কেউ বিপদে পাশে দাঁড়ালে, পরিবারের সদস্যরা নীরবে দায়িত্ব পালন করলে কিংবা পরিচিত কেউ সামান্য সহযোগিতা করলেও অনেক সময় আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। অথচ একটি আন্তরিক ধন্যবাদ মানুষের মনে আনন্দ জাগাতে পারে, দৃঢ় করতে পারে সম্পর্কের বন্ধন।কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে ‘ধন্যবাদ’ বলার নাম নয়; বরং অন্যের অবদানকে মূল্য দেওয়া, তার ত্যাগকে স্বীকার করা এবং ভালো কাজের যথাযথ সম্মান জানানোর মানসিকতা। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এই সহজ অভ্যাসটিই অনেকের কাছে কঠিন হয়ে ওঠে।
আপনজনের অবদানকে স্বাভাবিক মনে করার প্রবণতা
কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অনীহার অন্যতম কারণ হলো কাছের মানুষের অবদানকে স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে ধরে নেওয়া। সংসারের জন্য স্ত্রীর নিরলস পরিশ্রম, পরিবারের দায়িত্ব পালনে স্বামীর প্রচেষ্টা, সন্তানের জন্য মা-বাবার ত্যাগ কিংবা ভাই-বোনের সহযোগিতা—এসব অনেক সময় আলাদা করে মূল্যায়ন করা হয় না।
মনে করা হয়, এগুলো তো করতেই হবে। ফলে যে মানুষটি প্রতিদিন আমাদের জন্য কিছু করছেন, তাঁর অবদানই একসময় চোখের আড়ালে চলে যায়।
কিন্তু দায়িত্ব পালন করলেও মানুষের আন্তরিকতা, সময় ও শ্রমের মূল্য রয়েছে। সেই অবদান স্বীকার করলে সম্পর্কের মধ্যে সম্মান বাড়ে, ভুল-বোঝাবুঝি কমে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়।
অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা কৃতজ্ঞতার পথে বাধা
কৃতজ্ঞ হতে হলে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে হয়। বুঝতে হয়, জীবনের প্রতিটি অর্জন শুধু নিজের প্রচেষ্টার ফল নয়; এর পেছনে অন্য মানুষের সহযোগিতা, ভালোবাসা ও ত্যাগও থাকতে পারে।
কিন্তু অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষকে নিজের অবদান বড় করে দেখতে শেখায়। অন্যের সহযোগিতাকে তখন ছোট মনে হয়, এমনকি সাহায্য পাওয়ার পরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অনেকে দ্বিধা করেন।
ইসলাম মানুষকে অন্তরের সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যারা নিজেদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা পায়, তারাই সফলকাম। (সুরা আল-হাশর, আয়াত ৯)
অন্যের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া তাই কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয়; এটি নিজের চরিত্রকে সুন্দর করে তোলারও একটি অনুশীলন।
কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক
ইসলামে আত্মশুদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মানুষের আত্মা এবং তাকে সৎ ও অসৎ প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন করার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সে সফল হয়। (সুরা আশ-শামস, আয়াত ৭–৯)
কৃতজ্ঞতা চর্চার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের অহংকার, অবহেলা ও আত্মকেন্দ্রিকতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পায়। কেউ উপকার করলে তা স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি বিনয় ও সুন্দর মানসিকতার পরিচয়।
যে ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং অন্যের অবদান স্বীকার করতে শেখে, তার পক্ষে সম্পর্কের মধ্যে সম্মান ও সহমর্মিতা বজায় রাখা সহজ হয়।
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, মানুষের প্রতিও সম্মান
ইসলামে আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ারও শিক্ষা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫২)
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর দেওয়া নেয়ামত উপলব্ধি করা এবং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করা। একইভাবে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতার মূল্য দেওয়া এবং উপকারীর প্রতি সম্মান দেখানোও উত্তম চরিত্রের অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানানোর সঙ্গে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার ঘাটতির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। হাদিসটির বহুল প্রচলিত অর্থ হলো, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সুনানে আবু দাউদ ও জামে আত-তিরমিজিতে বর্ণিত)
কৃতজ্ঞতা সম্পর্ককে সুন্দর করে
একটি আন্তরিক ‘ধন্যবাদ’, কারও পরিশ্রমের প্রশংসা কিংবা প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর প্রতিদান—এমন ছোট ছোট আচরণ মানুষের মনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবারে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের অবদান স্বীকার করলে দৈনন্দিন দায়িত্বের চাপের মধ্যেও সম্মান বজায় থাকে। সন্তান মা-বাবার ত্যাগ উপলব্ধি করতে শেখে। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর সহযোগিতার স্বীকৃতি পারস্পরিক আস্থা বাড়ায়।
কৃতজ্ঞতা মানে সবকিছুর সঙ্গে একমত হওয়া নয়; বরং কেউ ভালো কিছু করলে সেই ভালো কাজের মূল্য স্বীকার করা। প্রতিদিনের জীবনে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ নেওয়া যায়:
কেউ সাহায্য করলে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানো।
পরিবারের সদস্যদের পরিশ্রমকে অবহেলা না করা।
অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করতে কার্পণ্য না করা।
নিজের প্রাপ্তি ও জীবনের ভালো দিকগুলো স্মরণ করা।
সুযোগ হলে উপকারীর পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার প্রতিদান দেওয়া।
কৃতজ্ঞতা শুরু হোক নিজের ঘর থেকে
মানুষ অনেক সময় দূরের কারও ভালো কাজ সহজেই স্বীকার করে, অথচ নিজের ঘরের মানুষের অবদান ভুলে যায়। এই অভ্যাস বদলাতে হলে প্রথমেই পরিবার ও কাছের মানুষদের প্রতি মনোযোগী হতে হবে।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বড় কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের ছোট ছোট সহযোগিতার স্বীকৃতিও মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। ইসলাম যে বিনয়, সদাচরণ ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেয়, তা জীবনে বাস্তবায়নের শুরু হতে পারে একটি আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে।
অন্যের অবদানকে মূল্য দিতে শেখা মানে নিজের মর্যাদা কমানো নয়; বরং নিজের চরিত্রকে আরও সুন্দর করে তোলা।

কোন মন্তব্য নেই