বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ছে, এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল সেবা
নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল প্রযুক্তির অংশগ্রহণ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। অনলাইন যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা গ্রহণে মোবাইল ফোন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যেও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও কম্পিউটার ব্যবহারের হার এবং পরিবার পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
বিবিএসের ‘আইসিটি ব্যবহার ও প্রয়োগ জরিপ ২০২৫-২৬’-এর চতুর্থ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ে বেড়ে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ।
একই সময়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহারের হারও সামান্য বেড়েছে। আগের বছরের ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে তা বেড়ে ৭৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে।
এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে মোবাইলনির্ভরতা বাড়ছে। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পরিবারে মোবাইল ফোনের ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন
দেশের পরিবার পর্যায়ে মোবাইল ফোনের ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৯ শতাংশ পরিবারে মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হয়।
এর মধ্যে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার শুধু মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল। আগের বছরের তুলনায় এই হার সামান্য বেড়েছে।
তবে মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং ব্যক্তিগতভাবে ফোনের মালিকানা এক বিষয় নয়। জরিপে দেখা গেছে, ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও ব্যক্তিগতভাবে মোবাইল ফোনের মালিক ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। আগের বছর এই হার ছিল ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থাৎ, অনেক ব্যবহারকারী পরিবারের অন্য সদস্যের বা অন্য কারও মালিকানাধীন ফোন ব্যবহার করেন। ডিজিটাল সেবায় সবার নিজস্ব ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
ইন্টারনেট গ্রাহক বেড়েছে, এগিয়ে ৪জি সেবা
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে। জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার।
একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বা পেনিট্রেশন রেট ৭৩ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে।
মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও ৪জি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। আগস্টে ৪জি গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজারে। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৯০ হাজার।
অন্যদিকে, ৩জি গ্রাহকসংখ্যা ২১২ লাখ থেকে কমে ১০৫ লাখে নেমে এসেছে। ৩জি ও ৪জি ব্যবহারকারী মিলিয়ে মোবাইল ব্রডব্যান্ড ব্যবহারের হার ৫৭ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে।
এদিকে, আইএসপি ও পিএসটিএন সংযোগের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড গ্রাহকসংখ্যা জানুয়ারির ১ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার থেকে বেড়ে আগস্টে ১ কোটি ৫৪ লাখে দাঁড়িয়েছে।
মোট মোবাইল গ্রাহকসংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী
বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশে মোট মোবাইল গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে ১৯ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজারে পৌঁছেছে। জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ৫৮ লাখ।
অর্থাৎ, সাত মাসের ব্যবধানে মোবাইল গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫২ লাখ ৯০ হাজার।
একই সময়ে ভয়েস ও ইন্টারনেট সেবা মিলিয়ে সামগ্রিক টেলিযোগাযোগ ঘনত্ব ১০৫ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০৮ দশমিক ২৭ শতাংশ হয়েছে।
তবে গ্রাহকসংখ্যা ও টেলিযোগাযোগ ঘনত্বকে সরাসরি স্বতন্ত্র মানুষের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একজন ব্যক্তি একাধিক সংযোগ ব্যবহার করতে পারেন।
কম্পিউটার ব্যবহারে অগ্রগতি সীমিত
মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়লেও কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর।
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ে কম্পিউটার ব্যবহারের হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, পরিবার পর্যায়ে কম্পিউটার মালিকানার হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া পরিবার পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার আগের বছরের ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও পরিবার পর্যায়ে ব্যবহারের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি ডিজিটাল প্রবেশাধিকারের পার্থক্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। ব্যক্তিগত ডিভাইস, সংযোগের খরচ, নেটওয়ার্কের মান এবং ব্যবহারের সুযোগ—এসব বিষয় ডিজিটাল সেবার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কমছে ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের ব্যবহার
দেশে প্রচলিত ফিক্সড-লাইন বা ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের ব্যবহারও কমছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রান্তিকে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারের কাছে ফিক্সড-লাইন টেলিফোন রয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।
মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা ও বহনযোগ্যতার কারণে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষ ক্রমেই মোবাইলনির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে প্রচলিত ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ
বিবিএসের জরিপে কম্পিউটার-সহায়তায় সরাসরি সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো জেলা ভিত্তিক প্রাক্কলন তৈরির উদ্যোগও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতি প্রান্তিকে ২ হাজার ৫৬৮টি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি এলাকায় ২৪টি পরিবার অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রতি প্রান্তিকে মোট ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়। বছরজুড়ে জরিপের আওতায় আসে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৮টি পরিবার।
এই তথ্য দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি মূল্যায়ন, নীতিনির্ধারণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার মাধ্যমে ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটছে। তবে এই অগ্রগতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ব্যক্তিগত ডিভাইসের সুযোগ, কম্পিউটার ব্যবহার এবং পরিবার পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধা যেন শহর ও গ্রামের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিই হবে আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদন: Times Express 24

কোন মন্তব্য নেই