মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে ফের গোপন বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের, আলোচনায় খনিজ ও প্রতারণাচক্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | Times Express 24
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে। এক মাসের মধ্যে এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় বৈঠক। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠক সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তির তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা। সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার কারণে তাঁরা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তবে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন পথ খুঁজছে।
এক মাসে দ্বিতীয় বৈঠক, বাড়ছে কূটনৈতিক তৎপরতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। সেই আলোচনায় এক মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি, মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধ এবং মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
এরপর টোকিওতে আবারও বৈঠক হওয়ায় দুই পক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আগ্রহ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, টোকিওর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনের বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। তবে মিয়ানমারের পক্ষে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ভ্যান্সের অংশগ্রহণ সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করেনি। দপ্তরটি জানিয়েছে, মিয়ানমারবিষয়ক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক বিভাগের। গোয়েন্দা ও গবেষণা বিভাগ নীতিনির্ধারকদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।
মার্কিন নাগরিকদের প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দিতে চায় ওয়াশিংটন
মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য অনলাইন প্রতারণাচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এসব চক্রের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভন, ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং অন্যান্য কৌশলে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে এসব অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি এখন শুধু আর্থিক ক্ষতির নয়, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনেরও প্রশ্ন।
তবে এসব প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী-সমর্থিত সরকারের সহযোগিতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। গবেষকদের মতে, অনেক প্রতারণাকেন্দ্র এমন এলাকায় অবস্থিত, যেগুলো বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। এসব অপরাধ থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছে যায় বলেও ধারণা করা হয়।
মিয়ানমারের সরকার অবশ্য জানিয়েছে, প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে তারা বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে।
বিরল মৃত্তিকা খনিজেও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যোগাযোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের বিষয়টিও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মিয়ানমারে ভারী বিরল মৃত্তিকা খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন এবং আধুনিক প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কৌশলগত এসব সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। মিয়ানমারের খনিজসমৃদ্ধ এলাকার অনেক অংশ সামরিক বাহিনীর বিরোধী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ফলে খনিজ উত্তোলন ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জটিল হতে পারে।
এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা খনিজের বড় ক্রেতা চীন। এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বাড়লে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা নীতিতে কি পরিবর্তন আনছে যুক্তরাষ্ট্র?
মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সাম্প্রতিক কয়েকটি পদক্ষেপে। গত সপ্তাহে মিয়ানমারের এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, মিয়ানমার নিয়ে তাদের নীতি পর্যালোচনার অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিতে গৃহযুদ্ধে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। ২০২১ সালে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলন দমনে তাঁর ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনাতেও তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনী ও তাদের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশটির বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সংঘাতের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বিমান হামলা ও সহিংসতার ঝুঁকিতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিদেশি শক্তিগুলোর যোগাযোগ নিয়ে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রপন্থী মহলে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অপরাধ দমন ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মিয়ানমার নিয়ে জাপানের হিসাব কী?
টোকিওতে বৈঠক আয়োজনে জাপানের ভূমিকা থাকলেও এ বিষয়ে দেশটির সরকার বিস্তারিত জানায়নি। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি তারা।
জাপান এখনো মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী-সমর্থিত সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। তবু দেশটিতে জাপানি ব্যবসা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। জাপানের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে প্রায় ৩০০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে; ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪০০টির বেশি।
অতীতে চীনের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় মিয়ানমারে জাপানের অর্থনৈতিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সামরিক অভ্যুত্থানের পরও অনেক জাপানি কোম্পানি দেশটিতে ব্যবসা চালিয়ে গেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাপানের সামনে একদিকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের হিসাব রয়েছে।
স্বার্থের সমীকরণে নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়
অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে মার্কিন প্রশাসন মিয়ানমারকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের দৃষ্টিতে নতুন করে মূল্যায়ন করছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের মজুত এই আগ্রহের অন্যতম কারণ হতে পারে।
তবে আলোচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ ফলাফল এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। প্রতারণাচক্র দমন, মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা, খনিজসম্পদের সরবরাহ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মতো বিষয়গুলো ওয়াশিংটনের বিবেচনায় থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, টোকিওর বৈঠক মিয়ানমারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু এই যোগাযোগের ফলে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কমবে কি না, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না, কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে কি না—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
প্রতিবেদন: Times Express 24

কোন মন্তব্য নেই