সাতক্ষীরায় যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দার ঝড়, জড়িতদের শাস্তির দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন। তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ঘটনার সময় প্রশাসনের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ও রাতে দুই দফায় মারধরের শিকার হন শামীম। প্রথম দফায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন রাতেই হামলাকারীরা হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার মারধর করে। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি ঘিরে নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং চিকিৎসাধীন ব্যক্তির সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠন।
‘সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়’, প্রশ্ন এনসিপির
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে গণপিটুনি এবং পুলিশের উদ্ধার করা একজন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনা আইনের শাসন ও নাগরিকের নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত।
দলটি প্রশ্ন তুলেছে, হাসপাতালের মতো জায়গায় একজন আহত মানুষও যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়?
এনসিপি আরও বলেছে, অভিযোগ সত্য কিংবা মিথ্যা যা-ই হোক, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
নিহত ব্যক্তির পরিবার তাঁর মানসিক অসুস্থতার বিষয়ে যে দাবি করেছে, সেটিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি এবং নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে।
গণসংহতি আন্দোলনের ভাষায় ‘চরম বর্বরতা’
দেবহাটার ঘটনাকে ‘চরম বর্বরতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে গণসংহতি আন্দোলন।
বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান আবদুর রশিদ ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান বলেন, উসকানি দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা এবং চিকিৎসাধীন একজন মানুষকে হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাঁরা বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিতে না পারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুতর ব্যর্থতার বিষয়।
বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা ও হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় মানবাধিকার সংস্থা
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটি ঘটনাটিকে মানবিক মর্যাদা ও জীবনের অধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এইচআরএসএসের বক্তব্য, কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার বিচার করার দায়িত্ব আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যার অধিকার নেই।
সংস্থাটি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন
ঘটনার প্রথম পর্যায়ে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও পরে হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে আহত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে সংগঠনগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে, অভিযোগের বিচার হতে হবে আইনানুগ প্রক্রিয়ায়—গণপিটুনি বা জনতার হাতে শাস্তির মাধ্যমে নয়
কোন মন্তব্য নেই