‘কী ছিলে তুমি আমার’—এক গানেই অমর মনি কিশোর, নাম বদলের পেছনে ছিল অন্য গল্প
বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যেগুলো সময়ের সীমানা পেরিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। মনি কিশোর তেমনই একজন শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া ‘কী ছিলে তুমি আমার’ গানটি আজও অসংখ্য শ্রোতার স্মৃতিতে অমলিন। জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছানোর পাশাপাশি নিজের নাম পরিবর্তনের পেছনের গল্প দিয়েও তিনি হয়ে আছেন আলোচনার বিষয়।
১৯৬১ সালের ৯ জানুয়ারি নড়াইল জেলার লক্ষ্মীপুরে জন্মগ্রহণ করেন মনি কিশোর। সংগীতপ্রেমী পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর শৈশব থেকেই গানের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহই একসময় তাঁকে নিয়ে আসে ঢাকায়, যেখানে আশির দশকের শেষ দিকে শুরু হয় তাঁর সংগীতজগতের পথচলা।
মনি মণ্ডল থেকে মনি কিশোর
সংগীতাঙ্গনে পরিচিতি পাওয়ার আগে তাঁর নাম ছিল মনি মণ্ডল। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘মনি কিশোর’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন। নাম পরিবর্তনের পেছনে ছিল কিংবদন্তি ভারতীয় সংগীতশিল্পী কিশোর কুমারের প্রতি তাঁর অনুরাগ।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজের নামের গল্প বলতে গিয়ে মনি কিশোর জানিয়েছিলেন, কিশোর কুমারের নাম থেকেই তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কুমার শানু নামের একটি অংশ নিয়েছেন, আর তিনি নিয়েছেন অন্য অংশ। এই নামের মধ্য দিয়েই যেন নিজের সংগীতজীবনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন প্রিয় শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা।
‘কী ছিলে তুমি আমার’ যেভাবে বদলে দেয় তাঁর জীবন
মনি কিশোরের সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ‘চার্মিং বউ’ অ্যালবামের মাধ্যমে। এই অ্যালবামের ‘কী ছিলে তুমি আমার’ গানটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। আবেগঘন কথা, হৃদয়স্পর্শী সুর এবং তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠের সমন্বয়ে গানটি দ্রুত শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রেম, বিচ্ছেদ আর হারানোর অনুভূতি—গানটির আবেগের সঙ্গে নিজেদের জীবনের নানা মুহূর্ত মিলিয়ে নিতে পেরেছেন বহু শ্রোতা। এ কারণেই সময় পেরিয়ে গেলেও গানটির আবেদন কমেনি।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ‘কে অপরাধী’ চলচ্চিত্রেও গানটি ব্যবহৃত হয়। পর্দায় জনপ্রিয় অভিনেতা ওমর সানীর ঠোঁটে গানটি দর্শকদের কাছে আরও পরিচিতি পায়। অ্যালবামের গান থেকে চলচ্চিত্রের পর্দা—এই যাত্রা মনি কিশোরের জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে।
সময় পেরিয়েও শ্রোতাদের মনে
সংগীতশিল্পীর সাফল্য কেবল জনপ্রিয়তার হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। কিছু গান মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, ভালোবাসা কিংবা হারানোর বেদনার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে সেগুলো আর শুধু গান থাকে না; হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। ‘কী ছিলে তুমি আমার’ তেমনই একটি গান।
মনি কিশোরের কণ্ঠে গানটির আবেগ ও পরিবেশনা তাঁকে নব্বইয়ের দশকের শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। নতুন প্রজন্মের কাছেও পুরোনো বাংলা গানের তালিকায় এটি এখনো পরিচিত একটি নাম।
২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার রামপুরার বাসায় মনি কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে যায় একটি কণ্ঠের পথচলা, কিন্তু থেমে থাকেনি তাঁর গানের যাত্রা।
মনি কিশোরের জীবন ও সংগীতের গল্প মনে করিয়ে দেয়—একজন শিল্পী হয়তো একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে শ্রোতাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। ‘কী ছিলে তুমি আমার’ গানটির মতো কিছু সৃষ্টি সময়ের সঙ্গে আরও বেশি স্মৃতিময় হয়ে ওঠে, আর সেখানেই শিল্পীর স্থায়ী পরিচয়।
TimesExpress24 | বিনোদন বিভাগ

কোন মন্তব্য নেই