পুঁজিবাজার বান্ধব মুদ্রানীতি আসছে নির্বাচনী বছরে !
বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিনিয়োগ এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশে মুদ্রানীতির কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে বলেও জানা যায়। তবে এ নিয়ে পুঁজিবাজারে চলছে আলোচনা। এবারের মুদ্রানীতি কেমন হবে কতটা পুঁজিবাজার বান্ধব হবে এ প্রশ্ন খোদ বিনিয়োগকারীদের। আগামী মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাকে গুরুত্বারোপ করা হবে। বাজার পতনের দায় নিতে যাবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, বছরের শুরুতেই বাজার হযবরল বিরাজ থাকলেও খুব শিগরিই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। নির্বাচন সামনে রেখে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। এর একটি অংশ আসবে পুঁজিবাজারে। যারা নির্বাচন করবেন তাদের আত্মীয়স্বজনরা বিদেশ থেকে অর্থ পাঠাবেন। এর একটি অংশও পুঁজিবাজারে যাবে।
সরকারও পুঁজিবাজার চাঙ্গা রাখতে উদ্যোগী হবে। কেননা ভোটের বছর সব সরকারই পুঁজিবাজার ভালো রাখার চেষ্টা করে। পুঁজিবাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিনিয়োগকারী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল মিলে প্রায় ১ কোটি ভোটার রয়েছে। এ কারণে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের তুষ্ট করতে পারলে এই ভোটের একটি অংশ সরকারের দিকে ঝুঁকবে। যার ফলে পুঁজিবাজার বান্ধব মুদ্রানীতির বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, তবে এবারের বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতি ঘোষণা করা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য চ্যালেঞ্জ। তারপরও সার্বিকভাবে বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। সরকারের শেষ সময়ে পুঁজিবাজার যাতে গতিশীল থাকে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হবে মুদ্রানীতিতে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে সর্ব প্রকার সরকার সহযোগিতা করবে। কারন সরকার এ দুর্নাম আর নিতে চায় না। পাশাপাশি সরকারের আন্তরিকতায় পুঁজিবাজার স্থিতিশীল থাকবে। তবে এ ধারা যেন অব্যাহত থাকুক, তা চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই নতুন মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার বিষয়টি গুরুত্বারোপ করা হবে।
এর আগে গত মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় গভর্নর পুঁজিবাজারে নজরদারি বাড়ানো দরকার এবং ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির কথা বলেছিল। এর পর থেকেই বাজারে পতন শুরু হয়। তবে এবার পুঁজিবাজার নিয়ে বক্তব্যে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে বলে জানা গেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, নির্বাচনী বছর সরকার যে কোন ভাবে পুঁজিবাজার চাঙ্গা রাখবে। গত কয়েকদিন ধরে বাজারে গুজব আছে আসন্ন মুদ্রানীতি সঙ্কোচনমূলক হবে। কিন্তু এবারের মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু থাকছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
রকিবুর রহমান বলেন, এবারের মুদ্রানীতিতে মুদ্রাস্ফীতি কমানো, মানি মার্কেটে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সবদিক বিবেচনা করে এবারের মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র বিনিযোগকারী তথা শেয়ারবাজারে কোনো রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মুদ্রানীতিতে এমন কিছু থাকবে না।
এদিকে নির্বাচনের বছরে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি ও আমদানির চাপ বেড়ে যাওয়াসহ কয়েকটি কারণে ‘সংযত’ মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। আগামী ৩১ জানুয়ারি (বুধবার) নতুন এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। যার বৈশিষ্ট্য হবে ‘সংযত’ বা সংকোচনমূলক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে ঋণ বিতরণ। বর্তমানে এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশেরও বেশি। আবার চাল, পেঁয়াজসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হারও বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকার কথা ৫ দশমিক ৮ শতাংশের নিচে। কিন্তু এরইমধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অসহনীয় মাত্রায় রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ; যা নভেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৮৩ ভাগ। এ মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ; যা নভেম্বরেও ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ একজন কমকর্তা বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণে সীমিত আয়ের মানুষদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ায় ব্যবসায়ীরা তাদের দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
তাই নতুন মুদ্রানীতিতে মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। এছাড়া চলতি বছরেই জাতীয় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়তে পারে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার অর্থনীতিবিদরাও মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিতে বলেছেন। এ কারণে মূল্যস্ফীতিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। যার বৈশিষ্ট্য হবে অনেকটা সংযত বা সর্তক বা সংকোচনমূলক।’
প্রসঙ্গত, আগের মুদ্রানীতিতে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর আগামী জুন পর্যন্ত এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচনি বছরে দেশে টাকার প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। আবার শেষ ছয় মাসে সরকারের খরচও বাড়বে। এতে ব্যাংক থেকে সরকারও বেশি ঋণ নেবে। এ কারণে আসন্ন মুদ্রানীতির ধরন ‘সংযত’ হওয়া জরুরি বলে মত দিয়েছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, ‘‘এই বছরের মুদ্রানীতি ‘সংযত’ বৈশিষ্ট্যের হওয়া জরুরি। কারণ, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। আবার ডলারের দামও বাড়ছে। আমদানির চাপও বেশি। বেসরকারি খাতে ঋণও বেশি গেছে। যে কারণে সামগ্রিক বিবেচনায় নতুন মুদ্রানীতির ধরন ‘সংযত’ হওয়া দরকার। তা না হলে সাগ্রিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করাটা কঠিন হয়ে যাবে। বেসরকারি খাতের এত ঋণ কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
আহসান এইচ মনসুরের মতো বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখতও মনে করেন, ‘নতুন মুদ্রানীতির ধরন সংযত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনের বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি সাধারণত বাড়ে। সাধারণত নির্বাচনের বছরে ব্যয় হয় অনেক। আবার বর্তমানে চাল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দামও বাড়তির দিকে। এ কারণে নতুন মুদ্রানীতির বৈশিষ্ট্য ‘সংযত’ হওয়া উচিত।’’ তবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ রোধ না করারও প্রস্তাব করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদও মনে করেন, ‘নতুন মুদ্রানীতি কিছুটা সংকোচনমূলক করা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘সব সময়ই নির্বাচনি বছরে মুদ্রার প্রবাহ বেড়ে যায়। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ারও আশঙ্কা থাকে। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা আছে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এই হার এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। অক্টোবরে ১৮ দশমিক ৬৩, সেপ্টেম্বরে ১৯ দশমিক ৪০, আগস্টে ১৯ দশমিক ৮৪ এবং জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। জুনে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিগত পাঁচ মাস ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। একইভাবে ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে আমদানির চাপে দেশীয় মুদ্রার (টাকা) বিপরীতে ডলারের বিনিময় হারও আকাশচুম্বী।
আবার রেমিটেন্স প্রবাহে কাঙ্ক্ষিত গতি না আসা এবং আমদানি ব্যয়ের অনুপাতে রফতানি আয় বৃদ্ধি না পাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনি বছর হওয়ায় সামনে টাকার প্রবাহও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে অর্থবছরের শেষ ৬ মাসে সরকারের খরচও বাড়বে।
এদিকে, যে সব ব্যাংক আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করছে, তাদের ঋণ বিতরণে সর্তক হওয়ার জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একক গ্রাহকসীমা অতিক্রম করা ১৬ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে তাদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায়ও আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ না করার জন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ২ বার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে থাকে। একটি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে এই মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হলো—মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের যোগান ধার্য করা ও মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।
মুদ্রানীতি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল দেশ প্রতিক্ষণকে বলেন, বিনিয়োগবান্ধব, প্রবৃদ্ধি সহায়ক মুদ্রানীতি প্রয়োজন। নতুন মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগের ওপর জোর দিতে হবে। কারণ সরকারি খাতে বিনিয়োগ হলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। এটা বাড়াতে হবে। এছাড়া ব্যাংক খাতে যে তারল্য রয়েছে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যদি চাঙা করা না যায়, তাহলে তা অলস পড়ে থাকবে।
সূত্র:


কোন মন্তব্য নেই