কাল এমপিদের শপথ আর নতুন সরকারের শপথ ১০ জানুয়ারির মধ্যে
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ফলাফল প্রকাশ এবং আওয়ামী লীগের বড় বিজয়ের পর এটা নিশ্চিত যে, শেখ হাসিনাই নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। এই সরকারে আর কারা থাকছেন, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ থেকে কে কে বাদ পড়ছেন, নতুন কারা যুক্ত হচ্ছেন, কে কোন দফতর পাচ্ছেনÑ দেশের সবখানে এখন এসব নিয়েই আলোচনা চলছে। এর সঙ্গে আরও যে প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে তা হলো- নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ কবে?
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাংবিধানিক কিছু বাধ্যবাধকতা মেনেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন সরকার গঠন করা হবে। টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছিলো ১২ জানুয়ারি। সংসদের অধিবেশন বসেছিল ২৯ জানুয়ারি। সেই দিকগুলো বিবেচনায় ধরে এবার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করেই সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১০ জানুয়ারি বা তার আগেই গঠিত হতে পারে নতুন সরকার। ১০ জানুয়ারি হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক দিন। আর তা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসাংবাদিত নেতা হিসেবে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে পা রেখেছিলেন। ঐতিহাসিক এই দিনটিকে স্মরণ করেই হয়তো ১০ জানুয়ারি এবারের সরকার গঠিত হবে বলে
জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। তাদের মতে, হয়তো এই দিনটিতেই শপথ নেবেন নতুন মন্ত্রিপরিষদ।
তবে সূত্রটি আরও জানিয়েছেন, যদি ১০ জানুয়ারির আগে নতুন সরকার গঠিত হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত হবে নতুন সরকারের নেতৃত্বে। তবে সবকিছুই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মহাজোটের নেত্রী শেখ হসিনার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলেও জানায় সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১০ জানুয়ারির মধ্যেই সরকার গঠন হতে পারে। ধানম-িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেছেন, গেজেট হওয়ার পর এমপিদের শপথ হবে। তারপর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তাকে বিজয়ী দলের প্রধান হিসেবে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। আমার মনে হয় এমপিদের শপথ, মন্ত্রীদের শপথ এবং সরকার গঠনসহ সব আনুষ্ঠানিকতা ১০ জানুয়ারির মধ্যেই সম্পন্ন হবে।’
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে বিজয়ী আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, সাংবিধানিক নিয়ম মেনে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই গঠিত হবে নতুন সরকার। অবশ্যই দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে সব।
অপরদিকে মহাজোটের অংশীদার ও বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আগামী ৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার শপথ নেবেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যরা।’ সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে বিএসআরএস সংলাপে তিনি আরও বলেন, ‘মহাজোট বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এটি নিশ্চিত যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এখনো কোনও সিদ্ধান্ত পায়নি। তবে আমরা সব সময়ের জন্য প্রস্তুত। সাংবিধানিক অনেক কিছুরই বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এগুলো মেনেই নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণের সবকিছু এগুচ্ছে। এক্ষেত্রে বঙ্গভবনেরও অনেক কাজ রয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের প্রেস সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন জানিয়েছেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করানোর জন্য বঙ্গভবন সব সময়ই প্রস্তুত রয়েছে। তবে এর আগে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কিছু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশের পর তারা শপথ নেবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন। রাষ্ট্রপতি তাকে বিজয়ী দলের প্রধান হিসেবে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন। এরপরেই তিনি মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব করবেন। এজন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এরপরেই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মাহম্মদ শফিউল আলম।
উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটের আগে গাইবান্ধা-৩ আসনের একজন প্রার্থীর মৃত্যু হলে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়। এ দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া ২৯৯টি আসনের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ৩টি কেন্দ্রে গোলযোগের কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। এ কারণে এই আসনে পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ২৯৮টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের শরিকরা মিলে (জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পাটি, জাসদ, তরিকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি-জেপি মঞ্জু) মোট ২৮৮টি আসনে বিজয়ী হয়। এ ছাড়া ড. কামাল হেসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ গণফোরাম, জামায়াত নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে ৭টি এবং ৩টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এসএম আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় নতুন এমপিদের শপথবাক্য পাঠ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদ। জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন।

কোন মন্তব্য নেই