মোবাইল ফোন আবিষ্কারের ৪৫ বছর
![]() |
| নিজের উদ্ভাবিত প্রথম মোবাইল ফোন হাতে মার্টিন কুপার। সূত্র: উইকিপিডিয়া। |
দৈনন্দিন জীবনে মানুষের বড় একটা সময় কাটে মোবাইল ফোনের সঙ্গে। যোগাযোগের প্রয়োজনে আবিষ্কৃত এই দরকারি ডিভাইসটি মানুষের জীবনের সাথে এমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, যে ক্ষেত্রবিশেষে মোবাইল ফোনই ব্যক্তির আইডেন্টিটির কাজ করে থাকে। তবে আজকের প্রজন্মের এই মোবাইল ফোন বহু পথ-পরিক্রমা পাড়ি দিয়ে এসেছে, যার প্রথম বড় উদ্ভাবনটি ছিল আজকের এই দিনে।
১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল মার্টিন কুপার উদ্ভাবিত ডায়নাট্যাক মডেলের তারবিহীন ফোনকেই প্রথম মোবাইল ফোনের স্বীকৃতি দেয়া হয়। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মটোরোলার Motorola DynaTAC ই আধুনিক বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন। আর সেই হিসেবে প্রথম বহনকারী ফোনের জনক হিসেবে স্বীকৃতি মেলে মার্কিন উদ্ভাবক মার্টিন কুপারের।
হাতে বহনকারী ফোনের ইতিহাস জানতে অবশ্য আরও পেছনের সময়ে ফিরতে হয়। ১৯১৭ সালে ফিনিশ উদ্ভাবক এরিক টিগারস্টেড পকেট সাইজ টেলিফোন আকৃতির বেশ পাতলা কার্বন মাইক্রোফোন এর পেটেন্ট করিয়ে নেন। সে সময় অ্যানালগ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির ব্যবহার ঘটিয়ে ট্রেন ও জাহাজের সাথে বন্দরের যোগাযোগের সেই ব্যবস্থাকে টেলিফোন যোগাযোগের ক্ষেত্রে চিন্তা-ভাবনা করা হয়, এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেলিফোন যোগাযোগ উন্নয়নে জোরেশোরে কাজ শুরু হয়। এসময় বেস স্টেশন ভিত্তিক টেরিস্ট্রিয়াল সেলুলার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা যা মোবাইল টেলিফোনি নামে পরিচিত, সেই প্রবর্তিত হয়। মোবাইল ফোন যুগের এই যোগাযোগ প্রযুক্তি জিরো-জেনারেশন বা শূন্য-প্রজন্ম হিসেবে অভিহিত হয়। এসময়ের টেলিফোনি’র অগ্রপথিক ছিল বেল সিস্টেম মোবাইল টেলিফোন সার্ভিস। তবে সেসময়ের এই মোবাইল সার্ভিসটি তারবিহীন নেটওয়ার্কি ছিল না। তবে ক্রমাগত নিরবিচ্ছিন্ন ফোন কল করা যেত, যদিও তা বেশ ব্যয়বহুল ছিল।
হাতে বহনযোগ্য মোবাইল ফোনের সাথে পরিচয় ঘটে জন মটোরোলার এফ মাইকেল ও মার্টিন কুপারের উদ্ভাবনের মধ্যে দিয়ে। মটোরোলা ডায়নাট্যাক মডেলের ২ কিলোগ্রাম ওজনের সেই ফোনটি ছিল বিশ্বের প্রথম বহনযোগ্য মোবাইল হ্যান্ডসেট।
তবে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম অ্যানালগ সার্ভিস চালু করে জাপানের নিপ্পন টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন। ১৯৭৯ সালে ১জি নেটওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে আক্ষরিক্ অর্থে মোবাইল ফোন সার্ভিস চালু করে জাপান। এরপর ১৯৮১ সালে ডেনমার্কের নর্ডিক মোবাইল টেলিফোন(এনএমটি) ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেনে তাদের সেবা কার্যক্রম চালু করে। ১৯৮৩ সালে DynaTAC 8000x মডেলের ফোন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ে মটোরোলা।
১৯৯১ সালে মোবাইল ফোনের দ্বিতীয় প্রজন্ম বা টু-জি যুগে প্রবেশ করে প্রযুক্তি বিশ্ব। ফিনল্যান্ডের রেডিওনিনজা প্রথম জিএসএম ঘরানার এই নেটওয়ার্ক চালু করে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় ১জি নেটওয়ার্ক অপারেটরদের।২জি নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য সার্ভিস ছিল জিপিআরএস (২.৫ জি) এবং এর অব্যবহিত পরে আসে এজ (২.৭জি) নেটওয়ার্ক।
এর দশ বছর পর ২০০১ সালে জাপানের এনটিটি ডকোমো নামের প্রতিষ্ঠানটি ডব্লিউসিডিএমএ মানের উন্নত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ৩জি আনে। এই প্রযুক্তির অনুসরণ করে 3.5জি বা ৩+ জি’র এইচএসপিএ বা পকেটে বহনযোগ্য উচ্চ গতির ইউএমটিএস নেটওয়ার্ক চালু হয় বিশ্বব্যাপী। আর এর মধ্যে দিয়েই দ্রুত গতির তথ্য আদানপ্রদানের যুগে প্রবেশ করে বিশ্ব।
২০০৯ সালে ৩জি নেটওয়অর্কে যুক্ত হয় স্ট্রিমিং মিডিয়া, যা ধীরে ধীরে আরও উচ্চ গতিসম্পন্ন ৪জি নেটওয়ার্কের উদ্ভব ঘটায়। ওয়াইম্যাক্স মানের দ্রুতগতি সম্পন্ন ৪জি নেটওয়ার্কের সাথে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেয় মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্প্রিন্ট। আর এলটিই মানের আরও গতি সম্পন্ন সেবা চালু করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান প্রতিষ্ঠান টেলিয়াসোনেরা।
৪জি’র যুগ বর্তমানে অস্তগামী। ৫জি ইতোমধ্যেই আবিষ্কার হয়ে গেছে, এর কয়েকটি সফল পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। যদিও বাণিজ্যিকভাবে এখনও চালু হয়নি, তবে চলতি বছরই এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ গতিশীল মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করার প্রতিযোগীতায় এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ।
আর নেটওয়ার্কের গতির সাথে পাল্লা দিতে সেই প্রযুক্তি সমর্থনযোগ্য হ্যান্ডসেটও বাজারে আনার আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো।

কোন মন্তব্য নেই