রাজশাহীতে যৌন হয়রানি ছিনতাই প্রতারণাসহ নানা অপকর্মে অটোরিকশা চালক সিন্ডিকেট
প্রায় ৮০ হাজার অটোরিকশার জটে ধুকছে রাজশাহী নগরী। এরই মধ্যে বাড়তি উপদ্রুব হিসেবে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়র অটোরিকশা চালক ও তাদের সিন্ডিকেট দলের সদস্যরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি।
রাজশাহীতে অটোরিক্সা চালকদের দৌরাত্ম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। একের পর এক অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে এই অটোরিকশা চালকরা। অটোরিকশার মধ্যে নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি এমনকি ছিনাতাইয়ের ঘটনা ঘটছে একের পর এক। এ নিয় নগরীতে বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখা দিয়েছে।
অটোরিকশা চালকদের সহযোগিতায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত ঘটনার পরে চরম আতঙ্কও নেমে এসেছে নগরবাসীর মাঝে। সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট রাজশাহী রেল ষ্টেশনে অটোরিক্সা চালকের সহযোগিতায় মার্কিন প্রবাসী নারীর ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
সূত্র মতে, গত ১৯ আগস্ট অটোরিকশা চালকদের সহযোগিতায় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হন। পরে অটোরিকশা থেকে ওই ছাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয় রাস্তায়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় ভুক্তিভোগী ছাত্রী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এতে অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামি করেছেন ওই ছাত্রী।
নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারণ চন্দ্র বর্মণ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ওসি নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, গত ২১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভুক্তভোগী ছাত্রী থানায় এজাহার দাখিল করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন অটোরিকশা চালক এবং অন্যরা তার পরিচিত কেউ।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে সড়কে ঘটনাটি ঘটেছে এরইমধ্যে সেই সড়কের পাশে থাকা ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা আসামিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। জড়িতদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রুয়েট ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার সময় ওই ছাত্রীকে অটোরিকশার ভিতরে য়েন নিগৃহ করা হয়। পরে তাকে অটোরিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে চলে যায় অটোরিকশা চালক ও তার সহযোগীরা।
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী রুয়েট’র ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী। ঘটনার পর ওই ছাত্রী নিজেই তাঁর ফেসবুকে ঘটনাটি তুলে ধরেন। পরে আলোচনায় আসে বিষয়টি। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়।
এর আগে গত ১০ আগস্ট নগরীর সোনাদিঘীর মোড়ে রুয়েট শিক্ষক রাশিদুল ইসলামের স্ত্রীকে যৌন হয়রানি করে তিন যুবক। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে ওই যুবকরা শিক্ষক রাশিদুলকে ধরে পেটান। পরে শিক্ষক তার স্ত্রীকে নিয়ে একটি অটোরিকশায় চড়ে চলে যাওয়ার সময় ওই যুবকরা আরেকটি অটোরিকশা নিয়ে তার পেছন পেছন গিয়ে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে অটোরিকশা চালককে আটক করতে পারেনি।
সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট রাজশাহী রেল ষ্টেশনে অটোরিক্সা চালকের সহযোগিতায় মার্কিন প্রবাসী নারীর ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সানজিদা খাতুন নামের ওই নারী তার স্বামীর সঙ্গে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফিরেন। এরপর ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে রাজশাহীতে যান। বনলতা ট্রেন থেকে গত ২১ আগস্ট নামার পরে রাজশাহী স্টেশন চত্তরে অটোরিকশা ধরার সময় তাঁর হাতব্যাগটি ছিনতাই হয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই নারীর পক্ষ থেকে রাজশাহী রেলওয়ে জিআরপি থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
ওই থানার ওসি আলী আকবর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি তদন্ত নেমেছে পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে গত গত ২০ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা থেকে রাজশাহীতে চিকিৎসা নিতে আসা হোসনে আরা পুতুল নামের এক নারীর নিকট থেকে অটোরিকশাচালকের সহযোগিতায় টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ওই পরে ওই নারী ও তার পরিবারের সদস্যদের নগরীর বহরমপুর মোড়ে গিয়ে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় অটোরিকশা চালক ও তার সহযোগীরা। তবে তিনি বিষয়টি কাউকে কিছু না বলে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি চলে যান টাকার অভাবে। এভাবে অটোরিকশা চালক ও তাদের সহযোগীদের হাতে প্রতিনিয়ত ছিনতাইসহ যৌন নিগৃহের শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেমার মানুষ। কয়েকটি সংঘবদ্ধচক্র এই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও নিশ্চিত করেছে পুলিশের একাধিক সূত্র।
নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা হযরত আলী বলেন, অটোরিকশাচালকদের অনেকেই মাদকসেবী এবং মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট। তারাও নগরীতে নানা অপরাধের সিন্ডিকেট গড়ে তুুুলেছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাস্তায় নেমে অটোরিকশা চালানোর নামে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এদের কারণে সাধারণ মানুষ এখনো আতংকিত। মানুষ একা অটোরিকশায় চড়তে ভয় পাচ্ছে।
রাজশাহী কলেজ শিক্ষাথী মনিরা খাতুন বলেন, ‘অটোরিকশায় ছিনতাইসহ যৌন হয়রানি করার কারণে আমরা এখন একা অটোরিকশায় চড়তে ভয় পাচ্ছি।’
নগরীর লক্ষীপুর এলাকার ব্যবসায়ী জোবায়ের হোসেন বলেন, রাজশাহী শহরের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষদের নানাভাবে প্রতারণা করছে অটোরিকশা চালকরা ও তাদের সিন্ডিকেট।
চাইলে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, অটোরিকশা চালকও তাদের সহযোগীদের দৌরাত্ম থামাতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। অটোরিকশা চালকদের কারণে নগরীতে একের পর এক ঘটছে নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা। তাদের নিয়ন্ত্রণে মহানগর পুলিশের কয়েকটি টিম।

কোন মন্তব্য নেই