শূন্য পকেটে কান্নার সারি: লুটেরাদের উৎসবের মাঝে রাজপথে যখন নিঃস্ব আমানতকারী - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

শূন্য পকেটে কান্নার সারি: লুটেরাদের উৎসবের মাঝে রাজপথে যখন নিঃস্ব আমানতকারী

 


আর্থিক খাতের জালিয়াতিতে নিঃস্ব হাজারো পরিবার; একদিকে বিলাসবহুল জীবনের আতিশয্য, অন্যদিকে সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | টাইমস এক্সপ্রেস ২৪ ঢাকা, বাংলাদেশ

যাঁদের ঘামে আর পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ, আজ তাঁরাই নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকু ফিরে পেতে শহরের রাজপথে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন। আর্থিক খাতের বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ লোপাটের নেপথ্য নায়কেরা যখন বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, তখন সাধারণ আমানতকারীদের জীবন কাটছে চরম অনিশ্চয়তা আর তীব্র হাহাকারে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের এই নীরব কান্না এখন দেশের আর্থিক খাতের এক চরম ও নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

চার দশক ধরে একটি সরকারি দপ্তরে সততার সাথে চাকরি করেছিলেন ষাটোর্ধ্ব এক প্রবীণ নাগরিক। অবসরে যাওয়ার পর পাওয়া পেনশনের পুরো টাকাটাই জমা রেখেছিলেন একটি সুপরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে—আশা ছিল, জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত চিকিৎসার খরচ আর একটু সচ্ছলতার সাথে কাটবে। কিন্তু আজ দুই বছর ধরে তিনি প্রতি সপ্তাহে ব্যাংকের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরছেন। নিজের জমানো টাকা থেকে মাত্র কয়েক হাজার টাকা তুলতে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

"আমার অপরাধ কী? আমি তো কারও কাছে হাত পাতিনি, ভিক্ষা চাচ্ছি না। নিজের সারাজীবনের উপার্জিত টাকাটা ফেরত চাচ্ছি। আজ আমার স্ত্রীর ক্যানসারের ওষুধ কেনার টাকা নেই, অথচ এই ব্যাংকের মালিকেরা নাকি বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচার করে প্রাসাদে থাকে।" > — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (টাইমস এক্সপ্রেস ২৪-কে দেওয়া সাক্ষাৎকার)

📌 বৈপরীত্যের চরম রূপ: বিলাসবহুল জীবন বনাম রাজপথের দীর্ঘশ্বাস

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সংকটের মূলে রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ও প্রভাবশালী মহলের লাগামহীন দুর্নীতি। নামে-বেনামে ভুনা কোম্পানি খুলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ লোপাটকারীদের অধিকাংশেরই স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এখনো স্পর্শ করা যায়নি। আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অদৃশ্য প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগ নিয়ে তারা দেশে এবং দেশের বাইরে বহাল তবিয়তে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন।

আন্তর্জাতিক মানের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই পরিস্থিতিকে ‘আর্থিক বৈষম্যের চরম বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যখন কোনো একটি দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে আমানত লুণ্ঠিত হয়, তখন কেবল একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং ধ্বংস হয়ে যায় হাজার হাজার সাধারণ পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।

📌 ভেঙে পড়া স্বপ্ন আর সামাজিক বিপর্যয়

আমানতকারীদের এই মিছিল কেবল গুটিকয়েক মানুষের বিক্ষোভ নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে রয়েছেন এমন মায়েরা, যাঁরা সন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাতে পারছেন না; এমন বাবারা, যাঁরা মেয়ের বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েও টাকা তুলতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসার মূলধন হারিয়ে এখন সম্পূর্ণ দেউলিয়া হওয়ার পথে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে বিগত কয়েক মাসে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য প্রায়শই দেখা গেছে, যেখানে গুরুতর অসুস্থ আমানতকারীরা হুইলচেয়ারে করে এসেও আকুতি জানিয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, তীব্র আর্থিক মানসিক চাপ এবং সময়মতো চিকিৎসার অভাবে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রবীণ আমানতকারী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন, যা এই অর্থনৈতিক সংকটকে একটি চরম মানবিক সংকটে রূপ দিয়েছে।

📌 বিশ্বস্ততা পুনরুদ্ধার ও কঠোর সংস্কারের দাবি

আন্তর্জাতিক সংবাদ পর্যবেক্ষণ ও নীতি নির্ধারকদের মতে, আর্থিক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের এই আস্থা সংকট দূর করতে হলে অবিলম্বে তিনটি বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

  1. সম্পদ ক্রোক ও বণ্টন: যারা এই অর্থ জاليةতির সাথে সরাসরি যুক্ত, তাদের সমস্ত দৃশ্যমান ও বেনামী সম্পদ দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বাজেয়াপ্ত করে তা নিলামের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে হবে।

  2. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: খেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের বিচারের জন্য বিশেষ ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

  3. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

যতক্ষণ না পর্যন্ত এই লুটেরাদের সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা তাদের হাতে ফিরে আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আর্থিক খাতের এই ক্ষত নিরাময় হওয়া অসম্ভব। সাধারণ আমানতকারীদের এই কান্না থামানো না গেলে তা পুরো অর্থনীতির কাঠামোর ওপর এক স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

© ২০২৬ টাইমস এক্সপ্রেস ২৪। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এটি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনা।

কোন মন্তব্য নেই