এমন বোঝা নিজের উপর চাপিয়ে দিও না যার ভার তোমরা সইতে পারবে না।
ছোটবেলায় যখন গ্রামে থাকতাম তখন আমাদের চাষের জমি ছিল। আমরা যারা ছোট ছিলাম ধান কাটার মৌসুম এলেই আমরা খুব একসাইটেড থাকতাম। ধান কাটার জন্য লোক ভাড়া করা হতো। তারা ধান কেটে, বড় বড় আটি বেঁধে, কাঁধে লাটি নিয়ে লাটির দুই প্রান্তে দুইটা করে আটি নিয়ে দুলতে দুলতে বাড়ীর উঠোনে ধান এনে রাখত। এই কাজগুলো আমাদেরও খুব করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু আমাদের বাবা মায়েরা বলতো আমরা এগুলো করতে পারবো না, অনেক ভারী হবে আমাদের জন্য। তারপরও আমরা জোরাজুরি করতাম। আমাদের জোরাজুরিতে আমাদের মাথায়ও কাটা ধানের আটি তুলে দেওয়া হত। উত্তেজনার বসে এটা করা কোন ব্যাপারই না এমন ভাব ধরা আমাদের সমস্ত উত্তেজনা একটু পরেই উবে যেত, ভার সইতে না পেরে একটু পরেই মাথা থেকে ধানের আটি ফেলে দিতাম।
.
অনেক সময়ই আমরা ক্ষণিকের ঈমানি জজবায় এমন সব কাজ করি কিংবা সিন্ধান্ত নিই দেখা যায় সেই কাজের পরের কন্সিকুয়েন্সগুলো কোনভাবেই ট্যাকল দিতে পারি না। শুরুতে আমরা এমন কাজ করার ক্ষেত্রে সাহাবীদের ঈমানোদীপ্ত ঘটনা আওড়াই, আল্লাহর উপর তাওয়াককুল আর ইয়াক্বিনের কথা বলি কিংবা নানাবিধ ঈমানের বাণী। কিন্তু সাহাবাদের সাথে আমাদের মূল পার্থ্যক্যটা হল সাহাবারা যখন আল্লাহর উপর ভরসা করে কোন কাজ করতেন সেই কাজের কন্সিকুয়েন্স হিসেবে দুনিয়ার যে ফিতনাগুলো আসত সেখানেও তারা আল্লাহর উপর ভরসা করতেন, সে ফিতনা যত কঠিনই হোক তারা কখনো আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিতেন না। কিন্তু আমাদের অবস্থা হল আমরা কাজটা করার সময় ঈমানের কথা বলি, আল্লাহর উপর ভরসার কথা বলি, কিন্তু যখন সেই কাজের কন্সিকুয়েন্স হিসেবে দুনিয়ার ফিতনা এসে পড়ে তখন আমরা সেই ফিতনাগুলোর মোকাবেলায় আর আল্লাহর উপর ভরসা করতে পারি না, তাওয়াককুল আর ঈমানের সেই জজবা তখন উবে যায়, দুনিয়ার উপর আখিরাতকে প্রাধান্য দেওয়া আর সম্ভব হয়না, সাহাবাদের উদাহরণও আর টেনে আনি না, সেই জায়গা দখল করে নেয় সামাজিকতা, বাস্তবতা আর হিকমাহর দোহায়। এভাবে একসময় দ্বীন আর আখিরাতের জায়গাটা দুনিয়া এসে নিয়ে নেয়, আর অন্তর থেকে দ্বীনও বেরিয়ে যায়।
.
সেরকমটা হলে অবিবেচকের মত প্রথম যে কাজটা আপনি করেছেন যার পরের ফিতনাগুলো আপনি ট্যাকল দিতে পারেননি তাহলে সেই কাজটা নিজের উপর জুলুল হয়েছে। আপনি এমন বোঝা নিজের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন যার ভার আপনি সইতে পারেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা এমন বোঝা নিজের উপর চাপিয়ে দিও না যার ভার তোমরা সইতে পারবে না।
.
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) রোযা রাখার ব্যাপারে নসিহত করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে বললেন মাসে তিনটি রোযা রাখতে। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বললেন তিনি এর চেয়েও বেশী সামার্থ্য রাখেন। এরপর সপ্তাহে দুইটি, তিনটি এভাবে যেতে যেতে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর যখন বললেন তিনি এর চেয়েও বেশী সামর্থ্য রাখেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন দাউদ (আঃ) এর মত রোযা রাখতে। দাউদ (আঃ) একদিন পরপর রোযা রাখতেন।
.
হাদিসের এই অংশটাই মূলত বেশী পরিচিত। কিন্তু এই হাদিসের একটা বর্ধিত অংশ আছে মুসনাদে আহমদে। যেখানে বলা হয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর জীবনের শেষ সময়ে খুব আফসোস করে বলেছিলেন, হায়! আমি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রথম প্রস্তাবটা মেনে নিতাম, অর্থাৎ মাসে তিনটি রোযা রাখার প্রস্তাবটা। কারণ শেষ বয়সে একদিন পর পর রোযা রাখার আমলটা উনার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। একবার এক সাহাবী আল্লাহর কাছে দোয়া করল, “ইয়া আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দান কর”। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দোয়া করতে মানা করলেন। কারণ ধৈর্য কখন দরকার পড়ে? যখন আমরা কোন বিপদে পড়ি, বালা মুসিবত আমাদের ঘিরে ধরে তখন। তাই ধৈর্য চাওয়া মানে হল তার কন্সিকুয়েন্স হিসেবে বিপদ, বালা মুসিবত চাওয়া। সেটা যে আমরা সইতে পারবো তার গ্যারান্টি কি। এটা তো নিজের উপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া।
.
তাই কোন কাজ করার আগে কিংবা কোন সিন্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের লিমিট কতটুকু যেটা জানা জরুরী। কতটুকু ভার আমি সইতে পারবো সেটার মেজারমেন্ট জানা জরুরী। অবশ্যই আমরা আল্লাহর উপর তাওয়াককুল করবো, আল্লাহর কাছে চাইব তিনি যেন আমাদের কাজকে সহজ করে দেন, আমরা বিশ্বাস করবো একমাত্র আল্লাহই পারেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে, কঠিনকে সহজ করতে, অবশ্যই আমরা সব কাজে আল্লাহর উপর ভরসা করবো। কিন্তু সেটা যেন একটা কাজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটা যেন শুধু সুসময়ে আওড়ানো ঈমানের বুলি না হয়, কঠিন সময়েও যেন সেই জজবা বজায় থাকে। আল্লাহ আমাদের এমন কাজ করা থেকে হেফাজত করুন যা নিজেদের উপর জুলুম হয়ে যায় । আল্লাহ আমাদের এমন ভার নিজের উপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে হেফাজত করুন যা সইবার ঈমান আমাদের নেই। ক্ষণিকের ঈমানের জজবায় এমন কাজ করা থেকে হেফাজত করুন যার পরবর্তী ফিতনা মোকাবেলার ক্ষমতা আমার নেই। আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিন। আমীন।

কোন মন্তব্য নেই