পুষ্টিহীনতা বাড়ছে করোনার প্রভাবে
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। কারণ এর প্রভাবে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে ৮২ শতাংশ। আর গ্রামাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় ৭৯ শতাংশ কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো রকমে তিন বেলা খেতে পারলেও পুষ্টিমান রক্ষা করতে পারছে না তারা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।
সারাদেশের ৫ হাজার ৪৭১ জন ব্যক্তির টেলিফোনে মতামত নিয়ে এই জরিপভিত্তিক গবেষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৯০ জন বা ৫১ ভাগ গ্রামাঞ্চলের আর ২ হাজার ৬৮১ জন বা ৪৯ শতাংশ শহরাঞ্চলের। এসব লোকের মধ্যে চরম দারিদ্র্য, দরিদ্র্য ও দারিদ্র্যসীমার ওপরে জীবন যাপন করলেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকিতে থাকে এমন মানুষ অন্তর্ভুক্ত। যারা দিনমজুর, ছোট ব্যবসা এবং স্বল্প বেতনের ওপর নির্ভরশীল।
করোনাভাইরাস এসব মানুষের জীবন যাপনে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, কীভাবে তারা প্রভাব মোকাবিলা করছে এবং কী ধরনের সহযোগিতা হলে তাদের সুবিধা হবে তা জানতে চাওয়া হয়েছে জরিপে। ফেব্রুয়ারি মাসে এসব মানুষের আয় কেমন ছিল এবং কী কাজ করত, তার সঙ্গে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আয় কত এবং কী কাজ করছে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পিপিআরসি ও বিআইডিজি সুপারিশ করেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্নি আয়ের মানুষের খাদ্য ঘাটতি পূরণে উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য সরকারকে ওমএমএস কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তা দিতে হবে। কম দামে বিক্রি কার্যক্রম উন্মুক্ত রাখতে হবে আর নগদ সহায়তা দিতে হবে চাহিদামাফিক।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে রেস্তোরাঁর কর্মী, বাসাবাড়িতে কাজ করেন যারা, রিকশাচালক, ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী; ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিপ পণ্যের মেরামতকারীসহ নিজের দক্ষতা দিয়ে স্বল্প পরিসরে কাজ করেন এমন লোকেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এদের আয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষের আয় কমেছে বেশি। ফলে অনেকে খাবার খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে বা এমন খাবার খাচ্ছে যাতে পুষ্টিমান ঠিক থাকছে না। এতে সামগ্রিকভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। আবার আগামীতে খাদ্য অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রচলিত ত্রাণ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে তিনি ওএমএস কার্যক্রম চালু করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের যেসব জনসাধারণ দারিদ্র্যসীমার ওপরে জীবন যাপন করে, কিন্তু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকিতে থাকে এমন মানুষের অবস্থা এখন সবচেয়ে খারাপ। এ শ্রেণির জনগণের ২০ শতাংশ বর্তমান অবস্থায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে।
জরিপে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ৬৩ শতাংশ কমেছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ নিজস্ব সঞ্চয়, পরিবারের অন্যদের সহায়তা, সামাজিক সহায়তা ও সরকারের সহযোগিতা দিয়ে চলছে। আর এক বা সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত এভাবে তারা চালিয়ে নিতে পারবে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চরম খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। সরকারি সহযোগিতা এখন পর্যন্ত অপ্রতুল। এনজিওগুলোর কোনো সহযোগিতা কার্যক্রম নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও এনজিও পর্যায়ের সহযোগিতা বাড়াতে হবে। খাদ্য ও নগদ অর্থ উভয় ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে।
পিপিআরসি বলছে, মানুষের খাদ্য সংকট দূর করতে এক মাসের জন্য ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্যাকেজ নিতে হবে। যার মধ্যে খাদ্য ও নগদ অর্থ থাকবে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, তাদের যে পরিমাণ আয় কমেছে, ততটা সাহায্য হলেই টিকে থাকতে পারবেন।
বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বলেন, গড়ে ৭০ শতাংশ ন্নি আয়ের মানুষের আয় কমেছে। লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। শহরে এই হার ৭১ শতাংশ। গ্রামে ৫০ শতাংশ। আর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ। এতে পুষ্টি গ্রহণ কমছে, বিশেষ করে প্রোটিন। অন্যদিকে খাদ্য সংকটের কারণে নতুন করে দারিদ্র্য সৃষ্টি হতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি বড় ধরনের সহায়তা কর্মসূচি দরকার।

কোন মন্তব্য নেই