নিউজ ফাস্ট

হাল ছেড়ে দেওয়া আপনার কাজ হতে পারে না!














হাল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কখনোই একদিনে হয়ে উঠে না। এর পিছনে থাকে শত চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হওয়ার তীব্র হতাশা। এর পিছনে থাকে দিনের পর দিন কঠিন পরিশ্রমের পরেও সফলতার মুখ না দেখার তীব্র বিষন্নতা। এর পিছনে থাকে কঠিন সময়, নিরন্তর চেষ্টা, অধ্যবসায় এবং অপেক্ষা। কিন্তু সফলতার একটি কঠিন সত্য হলো তা সহজপ্রাপ্য নয়। কঠিন ভাষায় বলতে গেলে, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়কে পুঁজি করে ব্যর্থতার সিঁড়ি পেরোলেই কেবল সফলতার মুখ দেখা সম্ভব।

আপনি যে মুহূর্তে ক্লান্ত হয়ে ভবিষতের অনুরূপ কষ্টের কথা চিন্তা করে হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন, তখন আরেকজন অতীতের কষ্টগুলোর কথা ভেবে সেগুলোর সার্থকতার জন্য চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনি যখন, ‘আর পারবো না’ বলে থেমে যাচ্ছেন আরেকজন, ‘আমিই বা কেনো পারবোনা’ বলে এগিয়ে যাচ্ছে।

আপনি যখন আপনার হাল ছাড়ার অজুহাত দেখাচ্ছেন, আরেকজন তখন সফলতাকে দূর থেকে অনুধাবন করছে। জীবনের সেই একটি লক্ষ্য পূরণে ব্রতী যখন আপনার আশেপাশের সবাইকেই কষ্ট করতে হবে, তাহলে হাল ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত আপনিই বা কেনো নিবেন। আর তবুও যদি এই চিন্তা মাথায় আসে, তবে একটিবারের জন্য হলেও নিচের বিষয়গুলি একবার ভেবে দেখবেন-







১. স্মরণ করুন, প্রশ্ন করুন, সিদ্ধান্ত নিন: খুব অবাক লাগলেও সত্যি, হাল ছেড়ে দেওয়ার কিছু পথ পরেই কিন্তু সাফল্যের দেখা মিলে।হাল ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে যে ‘আরেকটু কষ্টের’ জন্যে আমরা এই কঠোর সিদ্ধান্তটি নেই সেই ‘আরেকটু কষ্টের’ পরেই কিন্তু সাফল্য অধীর আগ্রহে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে।

সেই ‘আরেকটু কষ্টের’ পথটুকু পাড়ি দেওয়ার সময়, যখন আপনাকে হাল ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাটি সবচেয়ে বেশি ঘিরে থাকবে, তখন আপনি স্মরণ করুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন এবং অবশেষে সিদ্ধান্তে আসুন আপনি কি করবেন।

স্মরণ করুন আপনি কেন শুরু করেছিলেন। স্মরণ করুন কিসের জন্য আপনি এতকিছু করছেন। স্মরণ করুন তাদেরকে যারা বলেছিলো আপনি ব্যর্থ হবেন। স্মরণ করুন তাদেরকে যারা আপনার সাফল্যের অপেক্ষায় দিন গুনছে। স্মরণ করুন আপনার এতদিনের সেই কঠোর অধ্যবসায়কে।

এবং অবশেষে, প্রশ্ন করুন নিজেকে, শেষ মুহূর্তের জয়ের গরিমা কি বর্তমানের সকল কষ্ট, সকল পরিশ্রম এবং সকল যাতনার তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে? এবং উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে হাল ছাড়বেন না, নিবেন না এই কঠোর সিদ্ধান্ত।নিজের লক্ষ থেকে বিচ্যুত হবেন না। “If you can remember why you started, then you will know why you must continue.” – C Burkman

২. কঠিন সময়ের প্রতি পরিবর্তন করুন নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবর্তন করুন নিজের আচরণ: একই পরিস্থিতি, একই অবস্থান, একই রাস্তা- কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইটি প্রতিক্রিয়া।তাই বলেই কিন্তু গন্তব্য দুইটিও একেবারে ভিন্ন। “হয়েছে! আর পারবো না। আর হবে না আমাকে দিয়ে।অনেক চেষ্টা করেছি। আমি আর পারছি না।” “আচ্ছা! ঠিক আছে।সমস্যা নেই। এইতো সফলতার আরেকটু কাছে চলে এসেছি। আর অল্প একটু দূর। আর অল্প একটু কষ্ট।আমিই পারবো।”

লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আমরা সবাই এমন এক দ্বারপ্রান্তে আসতে বাধ্য যখন আমাদের কাছে সবকিছুই অসম্ভব বলে মনে হবে। ধৈয এবং অধ্যবসায়ের পরিচয় দেওয়াটা আরো কঠিনতর হবে, সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রমটা করা আর সম্ভব বলে মনে হবে না।

তখন কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটিকেই স্বাভাবিক বলে মনে হবে। শত চেষ্টার পরেও প্রথম আচরণটির প্রতি ঝুকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মনে হবে। অথচ একটি কথা কিন্তু ভুলে যাওয়া অনুচিত। সাফল্য কিন্তু স্বাভাবিক কিছু নয় বরং স্বাভাবিকের কোটায় সাফল্য আসাটাই কিন্তু অস্বাভাবিক।

এজন্য সাফল্য পেতে হলে কঠিন সময়গুলোতে নিজেকে ইতিবাচক রাখতে হবে। একটু কষ্ট হলেও আশ্বাস দিতে হবে নিজেকে কারণ কঠিন সময়ের ওই একটু খানি আশ্বাসই কিন্তু অস্বাভাবিক ওই সাফল্যকে আপনার কাছে ধরানি দিবে। “The reason why people give up so fast is that they tend to look at how far they still have to go, instead of how far they have come.”

৩. ব্যর্থতাকে পাবেন না ভয়, নিবেন না সিদ্ধান্ত হাল ছাড়ার: আপনি যদি প্রকৃতপক্ষে জীবনে এমন একটি লক্ষ্যের চয়ন করে থাকেন, যা শুধু আপনার নয়, আপনার আশেপাশের সবাইকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করবে, তবে আপনি নিশ্চিত থাকুন। লক্ষ্যের পথে আপনি একবার না একবার হলেও ব্যর্থ হবেন, হতে বাধ্য।

তবে সেই ব্যর্থতার পরেই কিন্তু আপনার লক্ষ্য, লক্ষ্যের সাফল্য, আপনার এতদিনের পরিশ্রমের প্রতিদান অপেক্ষা করে। John Greenleaf Whittier-এর ‘Don’t Quit’-কবিতাটি এই সম্পূর্ণ বিষয়টিকে অত্যন্ত সহজ সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করেন- When things go wrong as they sometimes will, When the road you’re trudging seems all uphill, When the funds are low and the debts are high
And you want to smile, but you have to sigh, When care is pressing you down a bit, Rest if you must, but don’t you quit.

Success is failure turned inside out— The silver tint of the clouds of doubt, And you never can tell just how close you are, It may be near when it seems so far; So stick to the fight when you’re the hardest hit— It’s when things seem worst that you must not quit. তাই ব্যর্থতায় ভয় পেয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভুল করবেন না।

৪. পারস্পরিক তুলনামূলক অজুহাতকে নয়, নিজের পরিশ্রমকে বিশ্বাস করুন: হাল ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে আমরা ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার’ সম্পূর্ণ বিষয়টিকে প্রশ্রয় কিংবা যুক্তিযুক্ত করার জন্য অনেক অজুহাত দিয়ে থাকি। যেমন- সে আমার তুলনায় অনেক মেধাবী। তার সুবিধা বেশি। সে বংশপরম্পরায় এমন কিছু পাচ্ছে যা আমি পাচ্ছি না। তার ট্যালেন্ট বেশি। তার জন্য সুপারিশ করার মতো লোক আছে।

এমন পারস্পরিক তুলনামূলক হাজারো অজুহাত দিয়ে আমরা আমাদের হাল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটিকে যথার্থ প্রমান করতে চাই।কিন্তু একটা কথা আমাদের জেনে নেওয়া দরকার।







তার কাছে কি আছে না আছে, সে কি পাচ্ছে বা না পাচ্ছে, সে কি অবস্থানে আছে না আছে, তা কখনোই আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় না। একমাত্র আপনি ছাড়া এবং কেবলমাত্র আপনি ছাড়া আপনার ভবিষ্যৎ আর কেউই নির্ধারণ করে দিতে পারে না, কেউই না। এখন এটা একমাত্র আপনার সিদ্ধান্ত আপনি কি এই অর্থহীন, অসার, তুচ্ছ অজুহাতগুলোকে নিজের জীবনে স্থান দিবেন নাকি পরিশ্রম, অধ্যবসায়, ধৈর্যকে আগলে রেখে যাত্রায় এগিয়ে যেতে চান। যদি দ্বিতীয়টি আপনার সিদ্ধান্ত হয় থাকে তবে হাল ছাড়বেন না।শুধু মনে রাখবেন-

“সে যদি বেশি মেধাবী হয়, আপনি হবেন অধিক পরিশ্রমী। তার যদি বেশি সুবিধা থাকে, আপনার অধ্যবসায় থাকবে বেশি। সে যদি বংশপরম্পরার বাক্স নিয়ে চলে, আপনি চলবেন ধৈর্যের ট্রাক নিয়ে। তার যদি ট্যালেন্ট বেশি থাকে, আপনি প্রচেষ্টাকে করবেন পুঁজি।” তবুও আপনি হাল ছাড়বেন না, নিবেন না এইকঠোর সিদ্ধান্ত।

৫. আত্মবিশ্বাসকে রাখুন জাগিয়ে: অসহনীয় ক্লান্তি, ব্যর্থতা, কঠিন সময়, নিরন্তর পরিশ্রম- এসকল মুহূর্তে, এসকল পথে যে জিনিসটি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয় পরে, তা হচ্ছে আমাদের আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস থাকে না বলেই কিন্তু এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমাদের জন্য আরো সহজ হয় উঠে, সহজ হয় উঠে হাল ছেড়ে দেওয়াটা।

আপনি মনে করছেন, মুখে বলাটা খুবই সহজ, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো দরকার। কিন্তু করাটা কঠিন।আপনি একেবারেই ঠিক বলেছেন। কিন্তু আবারো বলছি, কঠিন রাস্তা পাড়ি না দিয়ে গৌরব ও সফলতা পাওয়া মোটেও সম্ভব না।

এক্ষেত্রে Joyce Meyer এর কথাগুলো কিছুটা হলেও আপনার আত্মবিশ্বাসের টনক নাড়াবে। “It’s kind of hard you know to realize that you have to wait longer than you thought you would and things are a lot harder than you thought they would be. Things could be costing you more in your life than what you ever think you can bear and it just keeps going on & on, on & on & on. But the people who refuse to quit, the people who won’t give up, I can tell you, I promise you if you won’t quit & if you won’t give up, you will make it to the finish line.”

৬. কিছু বুলি যেনো বলি বারংবার, কিছু কথা যেনো আওড়াই শতবার: শুনতে বেশ হাস্যকর বলে মনে হবে। এমনকি পাগলামি বলে মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা মাথায় আসলে, আর কোনো সমাধান হাতে না পেলে, নিচের ট্রায়ালটা করে দেখতে অসুবিধেটাই বা কিসের। আমি বিশ্বাস করি আমি পারব। আমি বিশ্বাস করি আমাকে দিয়েই হবে। আমি বিশ্বাস করি আমার দ্বারা এটি সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি শেষটা আমারই হবে।

বাস্তবতা কি জানেন? বাস্তবতা হলো কঠিন সময় আপনার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের বড়ই অভাব পড়বে। যারাও কিনা পাশে দাঁড়াবে, তারা আপনাকে বেশি হলেও স্বস্তির ২-১টা কথা বলতে পারে, এর বেশি কিছু নয় এবং এর বেশি কিছু আশা করাটাও ভুল। তখন কিন্তু আপনাকে নিজেকেই নিজেকে দাঁড়িয়ে তুলতে হবে, নিজেকেই নিজেকে সাহস যোগাতে হবে, আবার পথচলার উদ্দমটাও কিন্তু নিজেকেই আনতে হবে।

তখন এরকম ৩-৪টা বুলি যদি একটু হলেও আপনাকে সাহস যোগায়, তাহলে হাল ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে এমন বুলি আওড়ানোই ভালো।
অজুহাতগুলোকে পাশ কাটিয়ে, কঠিন সময়ে নিজেকে ইতিবাচক রেখে, দরকারে ৩-৪ টি বুলিই না হয় আওড়িয়ে নিজেকে আশ্বাস দিয়ে আরো ২-৪ কদম যদি হাটা যায়, তাহলে বিশ্বাস করেন সম্পূর্ণ পথটাও কিন্তু পাড়ি দেওয়া আপনার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে ব্যর্থতার ভয়টাও আপনাকে কুপোকাত করতে ব্যর্থ।







আর সম্পূর্ণ ব্যাপারটির সারমর্ম কিন্তু একটিই। কঠিন সময়ের পরিশ্রম, ব্যর্থতা এবং ক্লান্তির ওই পথটুকু পাড়ি দেওয়ার মধ্যেই কিন্তু ‘আজকের সাধারণ আপনি’ এবং ‘ভবিষ্যতের সফল আপনি’ –এর মধ্যে ব্যবধান। এখন এটা একান্তই আপনার সিদ্ধান্ত, আপনি নিজেকে কি ভাবে বেছে নিবেন।

লেখক: রিয়া অধিকারী। তথ্যসূত্র: স্পাইক স্টোরি ডটকম।

No comments