নিউজ ফাস্ট

তরল দুধ বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে












কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশে তরল দুধ বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কোটি টনের বেশি দুধ বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে এক কোটি টনের কাছাকাছি। এতে দৈনিক প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে খামারিসহ সার্বিক দুগ্ধ শিল্পের। সে হিসেবে তিন মাসে ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। গতকাল এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (বিডিডিএফ)।

সংবাদ সম্মেলনে করোনায় দুগ্ধ শিল্পের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উপস্থাপন করে এ খাতকে বাঁচাতে ১২ দফা দাবিসহ এ সুপারিশ করেন বিডিডিএফ সভাপতি অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. কেবিএম সাইফুল ইসলাম।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার দুধ বিক্রি হয়। কভিড-১৯-এর ফলে খামারিরা তাদের উৎপাদিত দুধ বিক্রি করতে না পারায় চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অর্থসংকটে তারা গাভীগুলোকেও পর্যাপ্ত গো-খাদ্য সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে গবাদি প্রাণীর নানাবিধ অসুখ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাছাড়া বিপণন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলোও সক্ষমতা অনুযায়ী দুধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়া ও বিক্রি করতে পারছে না। তাদের বিক্রি প্রায় ৪০-৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।

কোনো খামারে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যয় গো-খাদ্য বাবদ হলে ওই খামার বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশে ডেইরি খামারের উৎপাদন খরচের ৭০-৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় গো-খাদ্য ক্রয়ে। এর জন্য খামারের অব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের গাভীর অভাব কিছুটা দায়ী হলেও মূল সমস্যা হলো গো-খাদ্যের উচ্চমূল্য। বাংলাদেশে গো-খাদ্য মূলত আমদানিনির্ভর। গো-খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেটে কতিপয় খাদ্য উপাদান যেমন—সয়াবিন অয়েল কেক (আরডি ৫%) এবং সয়াবিন প্রোটিন কনসেনট্রেটের (সিডি ১০%) আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে খামারের উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গো-খাদ্যে ভর্তুকি দেয়ার প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি খাতেও বর্তমান বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু ডেইরি খাতে অদ্যাবধি এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এ কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের সুরক্ষায় গো-খাদ্যের ওপর ভর্তুকি দেয়া আবশ্যক বলে মনে করে বিডিডিএফ।

সংগঠনটি বলেছে, বাংলাদেশের ডেইরি শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানীকৃত গুঁড়া দুধের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা। এসব গুঁড়া দুধ ভর্তুকিপ্রাপ্ত হওয়ায় এর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম, যার সঙ্গে বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদন প্রতিযোগিতা করতে পারে না। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ গুঁড়া দুধের আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রায় ২৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে। বাংলাদেশে গুঁড়া দুধের আমদানি শুল্ক মাত্র ১০ শতাংশ। এশিয়ার অন্যান্য দেশে এর হার ৫০ শতাংশের ওপরে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ২.৫ কেজি প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধের আমদানি শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এ আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে দেশের ডেইরির উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখবে না। এক্ষেত্রে বাল্ক ফিল্ড মিল্কের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাল্ক ফিল্ড মিল্ক নামে ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত যে দুধ বাংলাদেশে আমদানি হয় সেটি দেশের দুগ্ধ শিল্পের ধ্বংসের জন্য মূলত দায়ী। দুঃখের বিষয় ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত এ দুধের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়নি। এ দুধ জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। অতিসত্বর এ দুধের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে এবং অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করে দেশীয় দুগ্ধ শিল্প রক্ষার জোর দাবি করা হয়।

দুগ্ধ শিল্প রক্ষায় বিডিডিএফের করা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, সব ধরনের আমদানি দুগ্ধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করতে হবে। দেশে উৎপাদিত সব ডেইরি পণ্যের শুল্ক ও করহার শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। ডেইরি খাতকে টেকসই করার লক্ষ্যে প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ১০ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলি ডে’ ঘোষণা করতে হবে। স্থানীয় অপ্রাতিষ্ঠানিক বাজারকে ডিজিটালাইজড ও প্রাতিষ্ঠানিক বাজারকে শক্তিশালীকরণের জন্য মধ্যম/দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টাকার ‘গ্যারান্টি ফান্ড’ গঠন করতে। এছাড়া সম্প্রসারণ সেবাকে ডিজিটালাইজড ও খামারিবান্ধব করা, গো-খাদ্যসহ সব ধরনের ডেইরি উপকরণের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার, ডেইরিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে গাভী বীমা চালু, প্রান্তিক কৃষক যাতে সহজেই ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার অন্তর্ভুক্ত হয়, সেজন্য লম্বা গ্রেস পিরিয়ডসহ জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদান, বিদেশ থেকে মাংস আমদানি বন্ধ করা এবং ডেইরি পলিসি অনুমোদনসহ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠনের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিডিডিএফের সহসভাপতি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী, সহসভাপতি ড. কাজী ইমদাদুল হক, প্রচার সম্পাদক মো. মুতাসীম বিল্লাহ প্রমুখ।

No comments