ফিলিস্তিনি নেতাদের সমালোচনায় প্রভাবশালী সৌদি প্রিন্স
তিন পর্ব বিশিষ্ট এক টিভি অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে সোমবার আল অ্যারাবিয়ার একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রিন্স বন্দর। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের কেবল একটি দাবিই রয়ে গেছে, কারণ মূল নেতারা ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলিদের দাবি অন্যায্য হলেও, তাদের নেতারা সফল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। এটিই গত ৭০ থেকে ৭৫ বছরের ইতিহাসের সারমর্ম।
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, সোমবারের পর মঙ্গলবার অনুষ্ঠানটির দ্বিতীয় পর্ব প্রচারিত হয়। ৪০ মিনিট দীর্ঘ ওই পর্বটিকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি আরবের অবস্থান পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
তবে এসব বক্তব্য এমন একজন প্রিন্স দিয়েছেন যিনি এই মূহূর্তে সরাসরি সৌদি সরকারের অংশ নন। তবে তার এই বক্তব্যকে সৌদি সরকারের বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
৭১ বছর বয়সী প্রিন্স বন্দর ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত, দীর্ঘ ২২ বছর ওয়াশিংটনে সৌদি রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। সে সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পরিবারের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে কাজ করেন প্রিন্স বন্দর। সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে তার তত্ত্বাবধানেই ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের গোপন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বর্তমানে তার দুই সন্তান, প্রিন্সেস রিমা বিনতে বন্দর ও প্রিন্স খালিদ বিন বন্দর যথাক্রমে ওয়াশিংটন ও লন্ডনে সৌদি রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সমর্থন না থাকলে, আল-অ্যারাবিয়ায় এতক্ষণ কথা বলার সময় পেতেন না প্রিন্স বন্দর। সম্প্রতি আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের দুই মিত্র অর্থাৎ বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যে শান্তি চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বন্দর দাবি করেছেন, সেই প্রতিক্রিয়ার বিপরীতেই তিনি এসব কথা বলছেন।
ওই শান্তি চুক্তি অনুযায়ী, ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে আমিরাত ও বাহরাইন। কিন্তু চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না। ফিলিস্তিনিরা চুক্তিগুলোকে প্রতারণা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এই সম্পর্ক স্থাপনের বিপরীতে ফিলিস্তিনি নেতারা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাকে ‘নিম্ন পর্যায়ের আচরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বন্দর। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি নেতাদের এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত ছিল না।
কারণ, নিজেদের মধ্যেও তাদের আচরণ এমনই।
প্রিন্স বন্দর বলেন, আমি বিশ্বাস করি, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সৌদি আরব সবসময়ই ফিলিস্তিনিদের পাশে রয়েছে। তারা যখনই সাহায্য ও পরামর্শ চেয়েছে, আমরা বিনিময় পাওয়ার আশা না করেই, তা দিয়েছি। কিন্তু তারা কেবল সাহায্যটাই নিতো, পরামর্শ নিতো না।
নিজের বক্তব্যে সাবেক ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতেরও সমালোচনা করেন প্রিন্স বন্দর। ’৯০ এর দশকে কুয়েতে হামলা চালানোর পর ইরাকের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করায় আরাফাতের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, আরাফাতের পিএলও তখন জর্ডান ও লেবানন দখলের চেষ্টায় ছিল।
মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিরা বহু সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি বলেন, এটা আমাদের দোষ নয় যে, সৃষ্টিকর্তা তাদের এই ধরণের নেতা দিয়েছেন।
ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্ক নেই। সৌদি, ইসরাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খুব শিগগির তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনাও কম। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের প্রতি তাদের অবস্থান পাল্টেছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সৌদির অবস্থান এমন থাকলে এক পর্যায়ে ইসরাইলের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন হবে। এ পরিবর্তনের পেছনে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি উভয়ের নিজ ভূমির প্রতি অধিকার রয়েছে। এছাড়া, ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর মিল রয়েছে।
বাহরাইন ও আমিরাতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্থাপনেও সৌদির সম্মতি দেখা গেছে। রাষ্ট্র-পরিচালিত সৌদি মিডিয়ায় চুক্তিগুলোর প্রশংসা করা হয়েছে। সাধারণত নিষিদ্ধ হিসেবে পরিচিত, ইসরাইল ও ইহুদি ইতিহাস নিয়েও সম্প্রতি সৌদি গণমাধ্যমগুলোয় প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই