এশিয়ার আঞ্চলিক হুমকি - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

এশিয়ার আঞ্চলিক হুমকি



বর্তমানে এশিয়ার অর্থনীতি বৈশ্বিক, রাজনীতি স্থানীয়; নিরাপত্তা স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক। আফগানিস্তানে তালেবানের দ্রুত ক্ষমতায় ফিরে আসা এশীয়দের মনে করিয়ে দিয়েছে যে আমাদের নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। একইভাবে কভিড-১৯ মহামারী প্রশ্ন তুলেছে, কীভাবে সমগ্র অঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন কৌশল তৈরি করা যায়।


এটাই এ অঞ্চলের শেষ চ্যালেঞ্জ নয়। ভারত-চীন সীমান্তে চলমান অচলাবস্থা, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে উত্তেজনা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অনিশ্চিত গতিপথের মধ্যে এটা স্পষ্ট যে এশিয়া এখন নিরাপত্তা ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু।


আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানের ‘ইসলামিক আমিরাত’ যে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ লালন করবে তা মোকাবেলা করতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একটি জোট গঠনে বাধ্য করেছে; যার মধ্যে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান এমনকি ইরানও রয়েছে। তালেবানের দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তান তার নিজস্ব রাজনীতিতে ‘তালেবানীকরণ’ রোধ করার চেষ্টা করবে, কিন্তু তার সীমানার মধ্যে উগ্র ইসলামপন্থীরা এরই মধ্যে শক্তিশালী ও সাহসী হয়ে উঠেছে। চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এ সম্ভাবনার মুখোমুখি যে দেশীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও চরমপন্থীরা নতুন তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয়, অস্ত্র ও সমর্থন পাবে।


সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এটি একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী যা চীন, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার চারটি দেশ কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানকে সংগঠিত করেছে।


আফগানিস্তানের পরিবর্তন ভারতের জন্য হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এর কারণ হলো ভারত উচ্চতর ভিত্তিরেখা থেকে শুরু করছিল। কয়েক দশক ধরে দেশটি পাকিস্তান থেকে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের একটি উল্লেখযোগ্য হুমকির সম্মুখীন হয়েছে এবং এ সমস্যা মোকাবেলায় দেশটি ক্রমবর্ধমান সাফল্য অর্জন করেছে।


বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ইউরেশিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার দেশটিকে তার প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকারী ইস্যুতে মনোনিবেশ করতে সুযোগ করে দিয়েছে। যেমন চীনের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ। সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোয়াডের (অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) প্রথম নিজস্ব শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে এবং অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবরাহ করার জন্য এইউকেইউএস চুক্তি করে (একটি অপারমাণবিক রাষ্ট্রে এ ধরনের অস্ত্র এটাই প্রথম সরবরাহ)। একবার মোতায়েন করা হলে অস্ট্রেলিয়ার আটটি পারমাণবিক সাবমেরিন চীনের নিকটবর্তী সমুদ্রে সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে।


সাইবার নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে একটি নিরাপত্তা সংলাপ থেকে কোয়াড জনপরিসরে মূল্যবান পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম একটি বাস্তব বিশ্বের প্রতিষ্ঠানে বিকশিত হয়েছে। আঞ্চলিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা এখনো দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ব্যবস্থা, এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান এবং মালাবার নৌযুদ্ধ গেমের মতো অনুশীলনের মাধ্যমে তৈরি আন্তঃকার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন হলে এ ব্যবস্থাগুলো চীনের উত্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের জন্য একটি ব্যাপক ও নমনীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।


দ্য নিউ গ্রেট গেম


যদিও প্রাথমিকভাবে চীন-আমেরিকা উত্তেজনা বৃদ্ধি ভারতের পূর্ব দিকের দেশগুলো ও জলভাগকে প্রভাবিত করেছে। তবে এটা দ্রুতই পশ্চিম দিকে সরে যাবে। নতুন মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলই খেলার মধ্যে রয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে বিভক্ত করার প্রাথমিক আশা এরই মধ্যে কমেছে। সম্ভবত এটা হয়েছে প্রতিটি ইস্যু একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত করার চীনের জেদের কারণে। একই সময়ে দুই পক্ষের পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা দ্বারা চীন-মার্কিন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ম্লান করা কঠিন।


এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্য চীন-আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো একটি পক্ষ বেছে নেয়ার কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। আসিয়ানের অনেক সদস্য চীনের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা চায়। একইভাবে অঞ্চলজুড়ে সরকারগুলো নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিও বজায় রেখে চলেছে। তারা সতর্কভাবে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কারো পক্ষ নেয়া থেকে বিরত থেকে যেখানে সম্ভব স্থানীয় জোট গঠন করছে। কিন্তু চীন-আমেরিকা সম্পর্কের গতিপথের পরিপ্রেক্ষিতে এ কৌশলগত বিকল্পটিকে তারা ধরে রাখতে পারবে কিনা তা দেখার বিষয়। ‘এশিয়ান ন্যাটো’র মতো যেকোনো কিছুর প্রতি এ দেশগুলোর বিরাগ এরই মধ্যে স্পষ্ট। পক্ষ নেয়া ছাড়া মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন কীভাবে হয় তা ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা), এসসিও ও অন্যান্য বিকল্পের অব্যাহত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।


পক্ষ এড়ানোর আরেকটা কৌশল হলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তৈরি করা। তিন দশক ধরে এশিয়া একটি ক্রমবর্ধমান অস্ত্র প্রতিযোগিতার স্থান হয়ে উঠেছে (চীন যার নেতৃত্ব দিয়েছে)। বর্তমানে ভূমধ্যসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত, ইসরায়েল থেকে উত্তর কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত পারমাণবিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর একটি বেল্ট তৈরি হয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর ঠিক আগে জীবনঘাতী অস্ত্রের মালিকানা নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে উঠেছিল। সেগুলোকে এখন পুনরুদ্ধার চালানোর জন্য কার্যকর উদ্দীপনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।


এদিকে হিমালয়ের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চীনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের ফলে ভারত দ্বিগুণ আগ্রহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এক লাখেরও বেশি সৈন্য এখন সীমান্তে অবস্থান করছে। সিনিয়র ভারতীয় কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে আনুষ্ঠানিক মৈত্রী সম্পর্কে না থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির অংশীদারত্ব অবশ্যই গভীর হতে হবে।

ভারত-চীন সীমান্ত একটি জীবন্ত ইস্যু হয়ে থাকবে। কারণ চীনের কর্মকাণ্ড ১৯৯৩ সাল থেকে অনুসরণকৃত আস্থা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপগুলোর উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। উভয় পক্ষই সংঘর্ষ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কীভাবে হবে তা নিয়ে তাদের ভিন্নমত রয়েছে। ভারত ২০২০ সালের বসন্তের আগে সীমান্তে বিদ্যমান স্থিতিবস্থা পুনরুদ্ধার করতে চায় এবং এভাবে সীমান্ত সমস্যাটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। চীন যে নতুন স্থিতিশীলতা তৈরি করেছে তা বজায় রেখে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার আশা করছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ছে, ২০২১ সালের প্রথমার্ধে তা রেকর্ড গড়েছে। কিন্তু শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আগ্রাসী আঞ্চলিক অনুপ্রবেশ একসঙ্গে চলতে পারে না।


আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অন্যান্য হুমকির মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান, সেনকাকু বা দিয়াওয়ু দ্বীপপুঞ্জ। সেই সঙ্গে রয়েছে সাইবার আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তন, শক্তি সংকট ও মহামারীর মতো কিছুটা নতুন আন্তর্জাতিক ঝুঁকি। আবার যেহেতু চীন হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে দিয়েছে এবং ‘এক দেশ, দুই নীতি’র বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করেছে, সেজন্য তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ড থেকে ক্রমেই সামরিক জবরদস্তি এবং চাপের শিকার হতে হচ্ছে।


পারস্পরিক নিশ্চিত নিরাপত্তাহীনতা


আমাদের কি এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত যে এসব স্ফুলিঙ্গ শিগগিরই দাবানলের সৃষ্টি করবে? আমি বিশ্বাস করি যে বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, অন্তত বর্তমান পরিবেশে। যদিও এশিয়ায় বেশ কয়েকটি সংশোধনবাদী দেশ রয়েছে, বিশেষ করে চীন। যেকোনো প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ থেকে প্রাপ্য লাভ এর সম্ভাব্য খরচের চেয়ে বেশি হবে বলে মনে হয় না। তদুপরি পারমাণবিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করবে। তবে আঞ্চলিক সংঘর্ষ, গৃহযুদ্ধ ও প্রক্সি যুদ্ধের ঝুঁকি অবশ্যই বেড়েছে, একই সঙ্গে ভুল বিশ্লেষণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।


আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো এ সমস্যাগুলো মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ব্যবস্থার অক্ষমতা, যার বেশির ভাগই কিছু সময়ের জন্য স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি রয়েছে। এশিয়ায় স্থিতিশীল ও দৃঢ় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নিশ্চিত করবে এমন কোনো ক্ষমতার ভারসাম্য, নিয়ম, নীতিমালা বা চর্চা নেই। প্রাথমিকভাবে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অনেক সরকার তাদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয়তাবাদ ও জনতুষ্টির ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভর করছে। ফলে তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার জন্য বা বহুপক্ষীয় সমাধান অনুসরণ করার কৌশলের জন্য কম সুযোগ রেখে যাচ্ছে।


শিবশঙ্কর মেনন: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর

কোন মন্তব্য নেই