২০২২ সালের দুটি চ্যালেঞ্জ প্রথমটি রাজনৈতিক, দ্বিতীয়টি ভূরাজনৈতিক
প্রথমে বলব, সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা না গেলেও কভিড-১৯-কে শেষমেশ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কেননা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষই টিকার আওতায় চলে আসবে। প্রক্রিয়াটি যদিও রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক এক ধরনের ‘শক্তি’ বা ‘ক্ষমতা’র বিষয়টি সামনে আনবে, তবে গত দুই বছর ধরে সংক্রামক এ ব্যাধিটি আমাদের যেমন ভীতসন্ত্রস্ত করে রেখেছিল, তা অনেকটাই কেটে যাবে। তবে এ বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি যে কভিডের শুরুতে বৈশ্বিক অর্থনীতির কার্যক্রম থামিয়ে দেয়ার কাজটা যতটা না সহজ ছিল, এটিকে পুনরায় চালু করাটা অতটা সহজ হবে না। তাই মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম নয়, বরং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের জন্য ছোট ছোট পরিবর্তন প্রয়োজন। বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার যেমন—কৃষির থেকে রাতারাতি শিল্পে রূপান্তর, শিল্প থেকে পরিষেবা কিংবা শান্তির পরিবর্তে যুদ্ধে নেমে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হওয়াটা হবে ভুল।
বিগত সময়জুড়ে আমরা অনেক দমবন্ধ অবস্থার সাক্ষী হয়েছি, সামনে এমন আরো অনেক পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতে হবে। তাই উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত। সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় কিংবা কেনা-কাটার চেয়ে ই-কমার্স নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। বাড়বে জুমের মাধ্যমে যোগাযোগ কার্যক্রম। তাই বাণিজ্যিক কাজের জন্য অফিস কিংবা স্থানিক চাহিদা হ্রাস পেতে পারে, আবার বাণিজ্যিক এলাকা বাদে অন্য জায়গার চাহিদা বাড়তে পারে।
তাছাড়া, এর আগে শ্রমবাজার কখনো এতটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি। গত দুই বছরে শ্রমবাজারের কিছু জায়গায় যে ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, তা হয়তো স্থায়ী পরিবর্তনের আকার ধারণ করবে। এরই মধ্যে অনেকের মনে এ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে আমার এ কাজের আর কোনো আর্থিক মূল্য আছে কিনা? কিংবা এত কম বেতনের বিনিময়ে আমি কেন এতটা পরিশ্রম করব? আমরা দেখেছি, বর্ধিত বেকারত্ব সুবিধা প্রদানের মেয়াদ শেষ হলেও আমেরিকায় প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিকরা আরো বেশি মজুরির দাবি তুলছে, যা প্রায় চার দশক ধরে পুঁজির বড় অংশ শোষণের বিপরীতে শক্তির ভারসাম্যকে শ্রমের দিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
শ্রমিক সংকটের বিষয়টি মূল্যকে প্রভাবিত করবে এবং এ সামঞ্জস্যগুলোর মধ্যে দুর্ভাগ্যজনক অসামঞ্জস্যতাও থাকবে। সমস্যা হচ্ছে, আমরা জানি যে অতিরিক্ত চাহিদা থেকে উদ্ভূত মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি কিন্তু ভিন্ন। আর আমরা এখন যেমনটা ভাবছি তেমনটা ঘটবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুদের হার বৃদ্ধি বেকারত্বের পরিমাণ যতটা না বাড়িয়ে দেবে, তার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে শ্রমিক-কর্মীরা।
আরো দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, মহামারীর অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রশমিত করার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রণীত আর্থিক পরিকল্পনা আমাদের দুর্বল প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবিত করতে পারে। অনেক দেশের ভাগ্যই তাদের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্য মেয়াদে (এবং সম্ভবত স্বল্পমেয়াদেও) মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিল্ড ব্যাক বেটার এজেন্ডাতে অন্তর্ভুক্ত দক্ষতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মসূচি টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। আগের থেকে উন্নত শিশু দিবাযত্ন সুবিধা শ্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে আরো অধিকসংখ্যক নারীর। মহামারী নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমে আসবে এবং স্কুলগুলোও ক্রমেই খুলে যাবে। তাছাড়া উন্নত অবকাঠামোতে বিনিয়োগ পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াত ব্যয় কমিয়ে দেবে।
যা-ই হোক না কেন, টিকা সরবরাহ বৃদ্ধি এবং দরিদ্রদের জন্য এর সমান প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা সুদের হার বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে অনেক বেশি কার্যকর হবে। তাছাড়া আমাদের এ বিষয়টি উদযাপন করা উচিত যে ২০০৮ সালের মহামন্দার এক দশকেরও বেশি সময় পর বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক চাহিদার আবারো বৃদ্ধি ঘটছে। কেউ কেউ আশা করছে, এবারের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে সত্যিকারের সামাজিক সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা হবে, যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ঘাটতি মেটানো এবং মানুষ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ।
এ পর্যায়ে দুটি ঝুঁকি প্রসঙ্গে আলোকপাত করব।
দুর্ভাগ্যবশত, দিগন্তে আবছা দুটি কালো মেঘের আবির্ভাব ঘটছে। প্রথমটি রাজনৈতিক: আমেরিকার রিপাবলিক পার্টি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তাদের দলীয় আদর্শ পর্যন্ত বিকিয়ে দিয়েছে। তারা গণতন্ত্রের প্রতি তাদের নীতি-প্রতিশ্রুতিকে ত্যাগ করেছে। রিপাবলিকানরা এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতায় যেতে ও তা ধরে রাখতে তারা তাদের শেষ পর্যন্ত যেতে পারে। দলটি একটা সময় গোপনে ভোটার দমন কার্যক্রম চালাত, এখন তারা খোলামেলাভাবে ও গর্বের সঙ্গে এ কাজে লিপ্ত।সত্য, বাজেট, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং বহুত্ববাদের প্রতি শ্রদ্ধা ত্যাগ করে, রিপাবলিকান পার্টি স্পষ্টভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি বিশ্বের জন্য বর্তমান বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। দূরদর্শিতার আলোকে আমরা দেখতে পাই, এ ধরনের রাজনৈতিক বাঁকবদলের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য বিনিয়োগকারীরাই দায়ী। কিন্তু ২০০৮ সালের সময়কালে আমরা যেমনটা দেখেছি যে ধসে পড়ার আগ-অবধি বাজারগুলো ঝুঁকির বিষয়টি আমলে নেয় না। যে কেউই অনুমান করতে পারে, ২০২২ সালেও তারা এমনটি ঘটাবে। বিনিয়োগকারীরা করপোরেট করের হার কয়েক শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানোর সম্ভাবনার মতো ছোটখাটো বিষয়গুলোকে আরো বেশি গুরুত্ব দেবে।
দ্বিতীয় শঙ্কাটি ভূরাজনৈতিক। বর্তমানে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে অবস্থান করছে। দুই দেশের চলমান ক্রসফায়ারের মধ্যে অসহায় অবস্থায় নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে অন্য দেশগুলো। তবে এটা নিশ্চিত, বছর খানেক আগে ট্রাম্প যুগের বিরোধের সঙ্গে বর্তমান বিরোধের ধরনটি ভিন্ন। কেননা, ট্রাম্প যুগে চীনের উন্নতির নেপথ্যে আমেরিকার ভূমিকা আছে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল আর সামান্যই কথা বলা হয়েছিল মানবাধিকার বা গণতন্ত্র নিয়ে। এমনকি, চীন ও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের পরস্পরের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলোতেই মনোযোগ দিতে স্থির থাকতে দেখা যায়। আরো লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বাইডেন প্রশাসন এখনো ট্রাম্প যুগের আরোপিত কর প্রথার পরিবর্তন ঘটায়নি।
তাই সাধারণ জ্ঞান দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায়, অর্থনৈতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিংশ শতাব্দীর মতো করে সত্যিকারের একটি শীতল যুদ্ধ চালানোর জন্য পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। ঘটনাটি সত্যি হলেও তাদের আলাদা করা সম্ভব। তবে সাধারণ জ্ঞান আরো ইঙ্গিত করে যে চীন-আমেরিকার বিচ্ছেদের পরিণতি হবে অস্বাভাবিক মাত্রায় ব্যয়বহুল এবং তা বিশেষ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অর্থনীতিগুলোর সুযোগকেও সীমিত করবে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বায়নের বিশদ পুনর্মূল্যায়ন করার মাধ্যমে আমরা দেখতে পেয়েছি, বিশেষ ওই সুবিধা প্রাপ্তির মাধ্যমে জিডিপি খুব একটা লাভবান হয় না। তাছাড়া এর বণ্টনমূলক খরচও যতটা ভাবা হয়েছে, তার তুলনায় বেশি হতে পারে।
অনেকে অবশ্য বিভিন্ন পণ্য ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্ভবত অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের ওপর নির্ভর করে হয় না। যদিও অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো জটিল। উদাহরণস্বরূপ, উদীয়মান নতুন হুমকি মোকাবেলায় আমেরিকা বর্তমানে যে ধরনের শিল্পনীতি গ্রহণ করছে তা হয়তো স্বল্প ও দীর্ঘ উভয় মেয়াদের প্রবৃদ্ধি বাড়ার অনুপ্রেরক হতে পারে।
আমরা বর্তমানে যে নীতিগুলো বেছে নেব আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত তার প্রভাব থাকবে। আমরা হয়তো মহামারীর তীব্রতার অবসান ঘটিয়েছি, কিন্তু ২০২২ সালকে ঘিরে আমাদের অবশ্যই দ্রুততা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এমন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যা মহামারী-পরবর্তী আরো শোভন ভবিষ্যতের দিকে সবাইকে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
কোন মন্তব্য নেই