শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি, চীনা ঋণ, ঢাকাকে সতর্ক করলো ওয়াশিংটন
র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সংলাপে এ সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় সময় বুধবার সকালে শুরু হয়ে ৭ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকটি চলে। এ নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। সেখানে মোটা দাগে সংলাপের আউটকাম তুলে ধরা হয়। তবে বিজ্ঞপ্তিতে না থাকলেও অন্য কূটনৈতিক সূত্র মানবজমিনকে এটা নিশ্চিত করেছে, গত ২০শে মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত পার্টনারশিপ ডায়ালগের ধারাবাহিকতায় বুধবারের সিকিউরিটি ডায়ালগে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কিনতে লোন ও সাশ্রয়ী মূল্যের অফার পেয়েছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার প্রকল্প ইন্দো-প্যাসিফিকের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণারও ইঙ্গিত মিলেছে। উভয় প্রস্তাবের ওপর পরবর্তীতে আরও সুনির্দিষ্ট আলোচনায় সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
সংলাপে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছিলেন বনি জেনকিন্স, যিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশ নেন। মাসুদ বিন মোমেন ও ওয়াকার-উজ-জামান মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারির সঙ্গে আলাদা বৈঠকও করেন। বাংলাদেশ মিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মতে, নিরাপত্তা সংলাপে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, সামরিক প্রশিক্ষণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানো, নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (আইপিএস), সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো আঞ্চলিক বিষয়ও এতে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া বেসামরিক নিরাপত্তা নিয়েও কথা হয়। সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্র কিনতে দেশটির সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি জিসোমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) ও আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট) নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে সহায়তার বিষয়ে নিরাপত্তা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করে ধন্যবাদ জানানো হয়। সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে মর্মে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য ওয়াশিংটনকে সংলাপে ধন্যবাদ জানায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি সমস্যাটির সমাধানে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায় ঢাকা।
নিরাপত্তা সংলাপে আইপিএস নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিষয়ে বাংলাদেশ তার সমর্থনের কথা বৈঠকে জানিয়েছে। র্যাব ও তার সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশ অনুরোধ জানায়। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সময় সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে র্যাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, র্যাবের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তা একেবারেই অযৌক্তিক।
আলোচনার একপর্যায়ে এ বিষয়ে দুই পক্ষ ভবিষ্যতে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়।
নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি বিক্রির প্রস্তাব এবং...: বাংলাদেশকে নিরাপত্তা সহায়তার নতুন প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অনেকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ভারী সমরাস্ত্রসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয়ের কথাবার্তা চললেও দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ঢাকা আগ্রহ পাচ্ছিলো না। এ অবস্থায় ৫০ বছরের বন্ধুত্ব এবং প্রায় এক যুগের অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্কের খাতিরে বাংলাদেশকে এই বিশেষ সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করেছে দূর পশ্চিমের দেশটি। নিরাপত্তা সংলাপে এ নিয়ে আলোচনা হয়। সাশ্রয়ী মূল্যে মার্কিন সমরাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে সংলাপে আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করেছে ওয়াশিংটনের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র। প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছে। তবে তাৎক্ষণিক মার্কিন সরঞ্জামাদি কেনার ব্যাপারে ঢাকার প্রতিনিধিরা কোনো অঙ্গীকারে আবদ্ধ হননি।
ওয়াশিংটনে থাকা বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে গৃহীত ফোর্সেস গোল অনুযায়ী উন্নত সমরাস্ত্র সংগ্রহে বিভিন্ন উৎসে মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্র কিনতে দেশটির সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘জিসোমিয়া’ এবং ‘আকসা’ সইয়ের আলোচনা চলছে। ঢাকায় অংশীদারিত্ব সংলাপে জিসোমিয়ার খসড়া হালনাগাদ হয়েছে। মার্কিন সমরাস্ত্র কেনার পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রতিরক্ষা চুক্তি জিসোমিয়া স্বাক্ষর। নিরাপত্তা সংলাপেও জিসোমিয়ার সর্বশেষ খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এটি দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইন্দো-প্যাসিফিকে সম্পৃক্ততায় ঢাকার জন্য নতুন প্যাকেজ: নিরাপত্তা সংলাপে সমরাস্ত্র ছাড়াও মার্কিন অগ্রাধিকার প্রকল্প ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস)-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আইপিএস বিষয়েও নতুন প্রস্তাব পেয়েছে ঢাকা। স্মরণ করা যায়, মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড ঢাকায় ২০শে মার্চের অংশীদারিত্ব সংলাপ শেষে বলেছিলেন, আইপিএসে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত উপাদান রয়েছে। এই উদ্যোগের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র খুশি হবে। আইপিএসের মাধ্যমে সমুদ্রপথে অবাধে ও নিরাপদে পণ্যের সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেছিলেন, আইপিএস-এর অর্থনৈতিক উপাদানে বেশি জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। আইপিএস যেন কোনো পক্ষকে প্রতিহত করার জন্য না হয়, সেই নিশ্চয়তা চাইছে ঢাকা।

কোন মন্তব্য নেই