নিউজ ফাস্ট

সাইবারে অভিযোগের পাহাড়


১০ এপ্রিল ঢাকার আশুলিয়া থানার এনায়েতপুর থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফেসবুক আইডি হ্যাক করা লিটন ইসলামকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। তার কাছ থেকে হ্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি সিপিইউ, দুটি মোবাইল ফোন ও ১০টি সিমকার্ড জব্দ করা হয়। এ ছাড়া তার দখলে থাকা আড়াই হাজার দেশি-বিদেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের লগইন করার প্রয়োজনীয় ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ডের তথ্য পাওয়া যায়। টার্গেট ব্যক্তিকে মেসেঞ্জারে বার্তা দিয়ে টাকা দাবি করতেন ওই হ্যাকার। এর কিছুদিন আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার কোতোয়ালি এলাকা থেকে প্রতারক মেহেদীকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তিনি সিআইডির ইন্সপেক্টর সেজে এক তরুণীর সঙ্গে প্রতারণা করেন। নির্যাতন মামলা প্রমাণ করার জন্য ভুক্তভোগী এক তরুণীর কাছ থেকে কৌশলে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও নেন। সরল বিশ্বাসে ভুক্তভোগী তরুণী সিআইডি কর্মকর্তা ভেবে একান্ত গোপনীয় ফুটেজ তার কাছে শেয়ার করেন। ফুটেজ পেয়েই প্রতারক মেহেদী কাজের বিনিময়ে মেয়েটির কাছে ২ লাখ টাকা এবং রাত যাপনের দাবি করেন। এর বাইরেও অনেক প্রতারক চক্র ফিশিং লিঙ্ক পাঠিয়ে কৌশলে আদায় করে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। পরে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নিচ্ছে ফেসবুক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ। অর্থ হাতিয়ে নিতে নানা বিতর্কিত কিংবা বিকৃত কনটেন্ট ছেড়ে ভয় দেখাচ্ছে ভুক্তভোগীকে। বাধ্য হয়ে তার চাহিদা পূরণ করেন ভুক্তভোগী। মামুন নামের এমনই এক যুবককে গত বছর ২১ জুন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার থেকে গ্রেফতার করে ডিবির সাইবার বিভাগ।


গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, মামুন টার্গেট ব্যক্তিদের ফিশিং লিঙ্ক পাঠাতেন। ভিকটিমরা ক্লিক করলে ফেসবুক ইন্টারফেস আসত। তখন ভিকটিমরা ওই লিঙ্কে প্রবেশ করার জন্য তাদের ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড দিলে মামুনের হাতে সেগুলো চলে যেত। পরে মামুন ওই আইডি পাসওয়ার্ড দিয়ে ফেসবুকে প্রবেশ কর ভিকটিমের ফেসবুক আইডি পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ফেলতেন। এরপর তিনি নিজেই ওই ফেসবুক আইডি থেকে ভুক্তভোগীর নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতেন। এ ছাড়া ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করতেন। টাকা দিলে অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে দিতেন অন্যথায় ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তার দখলে রাখতেন। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সাইবার অপরাধ। নিরীহ মানুষ শিকার হচ্ছে নানা ধরনের অপরাধের। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে থেমে নেই সরকারের বিরুদ্ধেও নানা অপপ্রচার-ষড়যন্ত্র। মাঝেমধ্যেই ছড়ানো হচ্ছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা। সাইবার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্ক ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) সাইবার অপরাধ নিয়ে প্রতিদিনই গড়ে দেড় শর মতো অভিযোগ জমা পড়ছে। দিনকে দিন তা বেড়ে পাহাড়সম রূপ নিচ্ছে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি ১২ সেকেন্ডে দেশে একটি সোশ্যাল মিডিয়া আইডি খোলা হয় ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফরমগুলোতে। বিটিআরসির তথ্যমতে, এখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার। আর মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। অন্যের নামে নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত সিমের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে বড় বড় সাইবার অপরাধ। এর মাধ্যমেই সাইবার অপরাধীরা ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে অন্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করছে। সাইবার বুলিং, অনাকাক্সিক্ষত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধের ঘটনাও ঘটাচ্ছে। নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন নেটিজেনরা। ওটিটি কিংবা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, ভাইবার, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ইত্যাদির মাধ্যমে অনেকেই সাইবার অপরাধীদের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। এসব ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরমে কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে করা হচ্ছে হেয়প্রতিপন্ন, ভয় দেখানো বা মানসিক নির্যাতন বা অন্যায় কোনো কিছুতে প্রলুব্ধ। কিশোর-কিশোরীরাই প্রথম দিকে এ ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছিল। এখন বিভিন্ন বয়সীরা এ ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ সাইবার বুলিংয়ের শিকার ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ। সাইবার বুলিংয়ের নিয়মিত শিকার দেশের ৪৯ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, দেশের তিন-চতুর্থাংশ নারীই সাইবার বুলিংয়ের শিকার। তবে এ বিষয়টি অপ্রকাশিতই থেকে যায়। মাত্র ২৮ শতাংশ অনলাইনে নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ করে অভিযোগ দায়ের করেন। বাকিরা ভয়ে থাকেন অভিযোগ করলেই তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে হবে এই ভেবে। সাইবার বুলিং ছাড়াও মোবাইল ফোন বা ই-মেইলেও এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এসবের ফলে নারীসহ ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, অনিদ্রার মতো নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি আত্মহননের ঘটনাও ঘটছে।সাইবার ইউনিটের তথ্য বলছে, সাইবার বিষয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মামলা বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ শতাংশ। পরবর্তী বছর তা কিছুটা কমলেও ২০১৯ সালেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ শতাংশে। ২০২০ সালে সেটি বেড়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে। দেড় হাজারের বেশি মামলার তদন্তে উঠে এসেছে ভুক্তভোগী নারীদের ৯০ শতাংশই সাইবার পর্নোগ্রাফির শিকার। তাদের ৬০ শতাংশের বয়সই আবার ২০ বছরের নিচে। তারা সাবেক প্রেমিক বা স্বামীর মাধ্যমে সাইবার পর্নোগ্রাফির শিকার হয়েছেন।


ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান, অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে অনিবন্ধিত সিম বিক্রি বন্ধ করতে হবে। অনেক ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, দেশের নাটোর, মাদারীপুরের মতো এলাকাভিত্তিক চক্র গড়ে উঠেছে। চক্রের সদস্যরা সাধারণ মানুষের আঙুলের ছাপ নিচ্ছেন কয়েক দফায়। বোঝাচ্ছেন নেটওয়ার্কে সমস্যা। আগের কয়েক দফা ছাপ দিয়ে খুলছেন বিকাশ, নগদ কিংবা তুলে নিচ্ছেন কোনো সিমকার্ড। নইলে এ দেশে ১৮ কোটি সিম কারা ব্যবহার করছে? এর বাইরে ফিশিং লিঙ্ক বড় একটি আতঙ্কের বিষয়। কারোরই উচিত নয় নিজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করা।’


গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে তথ্য জালিয়াতি করে জাল সনদ তৈরি কিংবা ব্ল্যাকমেল করে ধর্ষণ এবং এর ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সাইবার অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। আইন করাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও এমন অপরাধ কমছে না। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, স্কাইপিতে ভুয়া আইডি খুলে জালিয়াতি ও প্রতারণা, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচার, আইডি হ্যাক, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনলাইনে জুয়াখেলাসহ অন্তত ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধ ঘটছে।


সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে আর্থিক খাত। সাইবার জগতে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে নিয়মিত দেশি-বিদেশি অনেক চক্র মোটা অঙ্কের অর্থ লুটে নিচ্ছে। বিগো লাইভ, টিকটকের মতো অ্যাপস সামনে রাখছে অপরাধীরা। কিন্তু এর নেপথ্যে বড় ধরনের ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম জড়িত। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনের এসব অপব্যবহার ও অপপ্রচার এখনই রোধ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত, গ্রেফতার ও অভিযোগ প্রমাণ করা সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের জন্য সময়সাপেক্ষ ও বেশ চ্যালেঞ্জিং। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি (এমএলএটি) না থাকা, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের লগ ডাটা সংরক্ষণে গাফিলতি, সংঘটিত অপরাধ সময়মতো না জানানো এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা ও দক্ষ জনবলের অভাব।


ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির পরিচালক (অপারেশন্স) তারেক বরকতউল্লাহ বলেন, ‘আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। সাইবার হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা ইউনিট এরই মধ্যে অনেকগুলো কাজ করেছে। আমরা একটি স্ট্র্যাটেজি পেপার তৈরি করেছি। শিগগিরই তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে পেশ করা হবে। তবে একটা বিষয় হলো, সাইবার সচেতনতার বিকল্প নেই। বিভিন্ন সেক্টরে এ উদ্যোগ নিতে হবে।’ এদিকে ফেসবুক আইডি হ্যাক প্রতিরোধে ডিবি প্রধান হাফিজ আক্তার সাতটি নির্দেশনার বিষয় উল্লেখ করে বলেন, যাচাই না করে কোনো ধরনের ‘ইউআরএল’ (টজখ) লিঙ্ক ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো ‘ইউআরএল’ লিঙ্কে ক্লিক করার পর কোনো ফেসবুক পেজে বা অন্য কোথাও রিডাইরেক্ট হলে লগইনের জন্য ফেসবুক আইডি/পাসওয়ার্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার ফেসবুক আইডিতে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের সঙ্গে একটি ই-মেইল অ্যাড্রেস যোগ করে রাখুন। অথোরাইজড লগিনস (অঁঃযড়ৎরুবফ ষড়মরহং) অপশন চেক করুন। ফেসবুক আইডি বা মেসেঞ্জারে একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও কথোপকথন রাখা থেকে বিরত থাকুন। মোবাইলে আসা নোটিফিকেশনে ‘ইয়েস’ কিংবা ‘নো’ (ণবং/ঘড়) ক্লিক করার আগে ভালোভাবে পড়ে নিন। ফেসবুকে তিন থেকে পাঁচজন ট্রাস্টেড (বিশ্বস্ত) কনটাক্ট যোগ করুন।

কোন মন্তব্য নেই