গ্যাস সঙ্কট ও লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

গ্যাস সঙ্কট ও লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ

 

**গ্যাস সঙ্কট ও লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ

রফতানিতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা**

স্টাফ রিপোর্টার | সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দেশজুড়ে গ্যাস সঙ্কট ও বিদ্যুৎ লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করায় শিল্প খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। স্বল্প গ্যাসচাপ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে বহু কারখানা এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও কোথাও আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতেও বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি

জ্বালানি খাতের তথ্যমতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিসিএফডি, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২.৬–৩ বিসিএফডি। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে ১.২ বিসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া, অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে আমদানিও কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এতে আরও চাপ যোগ করেছে।

২০১৭ অর্থবছরে যেখানে দেশে গ্যাস উৎপাদন ছিল ৯৭২ বিলিয়ন ঘনফুট, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ বিলিয়ন ঘনফুটে

টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পে মারাত্মক প্রভাব

বিটিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসনির্ভর প্রায় ৪০০ টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিল পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক মিল ৩০–৫০% সক্ষমতায় চলছে; কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ৬০–৭০% পর্যন্ত কমে গেছে।

সিরামিক, সিমেন্ট, ইস্পাত ও কাচ শিল্পেও পরিস্থিতি একই। গ্যাসচাপ কম থাকায় বয়লার ও চুল্লি স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

লোডশেডিংয়ে উৎপাদন লাইন বন্ধ, যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত

গ্যাসঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। ফলে শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

অনেক শিল্পমালিক অভিযোগ করছেন—কিছু এলাকায় দিনে ২০–৩০% সময় বিদ্যুৎ থাকে না। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে এবং কাজের ঘণ্টা নষ্ট হয়ে বাড়ছে ক্ষতি।

ব্যয় বাড়ছে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা

গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে, যা গ্যাসের তুলনায় কয়েকগুণ ব্যয়বহুল।
কাঁচামালের অপচয়, উৎপাদন বিলম্ব ও শ্রমিকদের নিষ্ক্রিয় সময়—সব মিলিয়ে মোট উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামেও ধরা যাচ্ছে না।

রফতানিতে অনিশ্চয়তা: অর্ডার হারানোর ঝুঁকি

বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন,
“উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো শিপমেন্ট করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে, যা অর্ডার বাতিল বা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।”

রফতানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় চাপ পড়বে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।

চাকরি হারানোর আশঙ্কা

উৎপাদন কমায় অনেক কারখানায় ওভারটাইম বন্ধ হয়েছে, কোথাও শিফট কমানো হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকদের আয় কমছে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে জোর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর এমন সঙ্কটের পুনরাবৃত্তি রোধে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
তাদের সুপারিশ—

  • নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার

  • এলএনজি আমদানিতে স্থিতিশীলতা

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি

  • জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার

  • শিল্পে জ্বালানি-দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“এই সঙ্কট দীর্ঘ হলে শিল্পায়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

সরকার বলছে—পরিস্থিতি সাময়িক

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এলএনজি আমদানি বাড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করা এবং গ্যাস বণ্টনে সমন্বয় আনতে কাজ চলছে।


গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট এখন শিল্প খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে উৎপাদন, রফতানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।


কোন মন্তব্য নেই