ইসলামি আইনে ঘুষের শাস্তি কী? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24
ঘুষ গ্রহণ শুধু সামাজিক ও নৈতিক অপরাধ নয়, ইসলামের দৃষ্টিতেও এটি গুরুতর পাপ। ঘুষের মাধ্যমে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার মতো অন্যায় সংঘটিত হয়। তাই ইসলাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা—উভয়ের ব্যাপারেই কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
তবে ইসলামি আইনে ঘুষের জন্য চুরি বা ব্যভিচারের মতো নির্দিষ্ট কোনো অপরিবর্তনীয় শাস্তি নির্ধারিত নেই। এ অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হয় ‘তাজির’ নীতির আওতায়, যা অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচারক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে পারে।
ঘুষের বিষয়ে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না এবং মানুষের সম্পদের কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ কোরো না।’
হাদিসেও ঘুষের বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। সুনানে আবু দাউদের ৩৫৮০ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর অভিশাপ দিয়েছেন বলে বর্ণিত হয়েছে।
তবারানির আল-মুজামুল আওসাত গ্রন্থেও ঘুষের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
ইসলামি আইনে ঘুষ কোন ধরনের অপরাধ?
ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় ঘুষ ‘হদ’ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত নয়। হদ হলো এমন কিছু অপরাধ, যেগুলোর জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ঘুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শাস্তির পরিমাণ নির্ধারিত না থাকায় এটি ‘তাজির’ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাজিরের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব, ক্ষতির মাত্রা, অপরাধীর ভূমিকা এবং সমাজের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়। ফলে ঘুষের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
ঘুষ গ্রহণের জন্য কী শাস্তি হতে পারে?
ইসলামি আইনশাস্ত্রে তাজিরের আওতায় ঘুষের অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান থাকতে পারে। যেমন—
সরকারি বা বিচারিক পদ থেকে অপসারণ।
কারাদণ্ড।
আর্থিক জরিমানা।
অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
তবে এসব শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, প্রমাণ এবং শরিয়তের বিধান অনুসরণ করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে কাউকে শাস্তি দিতে পারেন না; এ ধরনের সিদ্ধান্ত বৈধ বিচারিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়।
ঘুষের টাকার পরিণতি কী?
ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ বৈধ উপার্জন হিসেবে গণ্য হয় না। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, অন্যের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে অর্থ নেওয়া হলে তা ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। আর প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করা বা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে এ বিষয়ে যোগ্য আলেম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঘুষ দমন কেন জরুরি?
ঘুষের কারণে সমাজে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়, যোগ্য ব্যক্তি অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা, বিচারক কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ঘুষ গ্রহণ করলে সাধারণ মানুষের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ইসলাম তাই ঘুষকে শুধু ব্যক্তিগত পাপ হিসেবে নয়, সামাজিক ক্ষতির কারণ হিসেবেও বিবেচনা করে। সংক্ষেপে বলা যায়, ঘুষের জন্য নির্দিষ্ট হদ শাস্তি না থাকলেও এটি গুরুতর তাজির অপরাধ। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী রাষ্ট্র বা বিচারিক কর্তৃপক্ষ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই