নড়াইলে প্রতি মৌসুমে শতকোটি টাকার পাটকাঠি বিক্রি - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

নড়াইলে প্রতি মৌসুমে শতকোটি টাকার পাটকাঠি বিক্রি


পূর্বপুরুষ থেকে নড়াইলের কৃষকরা পাট আবাদ করলেও তখন তারা শুধু আঁশ ছাড়িয়ে কাঁচাপাট বাজারে বিক্রি করতেন। তাদের উৎপাদিত পাটকাঠি নিজেদের জ্বালানি ও বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করতেন। কয়েক বছর ধরে নড়াইলের পাটকাঠি বিভিন্ন কোম্পানিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জেলার জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে এখন নড়াইলের পাটকাঠি যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর আকারে বড় পাটকাঠি কাউন হিসেবে এবং ছোটগুলো কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আবার অনেক কৃষকের জমি থেকেই পাটকাঠি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাটকাঠির বেচাকেনা হয় নড়াইল জেলার তিনটি উপজেলায়। এতে লাভবান হচ্ছেন জেলার কৃষকরা। এ ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত জেলার অন্তত ১২ হাজার ছোট-বড় ব্যবসায়ী। এক সময়ের ফেলনা পাটকাঠির বর্তমানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় খুশি এলাকার কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা।


কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পাটকাঠি ছোট ও বড় দুটি শ্রেণীতে ভাগ করেন। বড়গুলো কাউন হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করেন। ছোট পাটকাঠি কেজিতে বিক্রয় হয়। স্থানীয়ভাবে সাধারণত ১ হাজার ২৮০ পিস পাটকাঠিতে এক কাউন হয়। এক কাউন পাটকাঠি ৩০০-৩৫০ টাকা দরে বিক্রয় করেন স্থানীয়রা। ছোট পাটকাঠি ১০-১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।


নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ২২ হাজার ৪৪৪ হেক্টর পাট উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও উৎপাদন হয়েছে ২৩ হাজার ২৫ হেক্টর। এক হেক্টরে ৪ দশমিক ৪৬ টন পাটকাঠি উৎপাদন হয়। সে হিসাবে চলতি বছর নড়াইলের তিনটি উপজেলায় পাটকাঠি উৎপাদন হয়েছে অন্তত এক লাখ টন। ১০ টাকা দরে কেজি বিক্রি হলেও বাজারমূল্য শতকোটি টাকার বেশি। জেলায় যে পাটকাঠি উৎপাদন হয় তার প্রায় ৮৫ ভাগ পাটকাঠি কৃষকরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় এক লাখ টন পাটকাঠি বিক্রি হবে বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যার বাজারমূল্য শতকোটি টাকার বেশি।


লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর গ্রামের কৃষক সোহেল বেগ জানান, চলতি বছর তিনি দুই একর পাটের আবাদ করেছিলেন। তার জমিতে উৎপাদিত কিছু পাটকাঠি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বাকিটা তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ৪৮ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন।


দীঘিরপাড় এলাকার শোভা সরদার (৫৯) জানান, প্রতি বছর তিনি পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে মালিকদের কাছ থেকে তিনি পাটকাঠি নিয়ে আসেন। এ কাজ করে চলতি মৌসুমে তিনি যে পাটকাঠি পেয়েছেন তা ৩৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।


ব্যবসায়ীরা জানান, বাছাইকৃত বড় পাটকাঠি সাধারণত বরজে ব্যবহার করা হয়। এ পাটকাঠির দামও বেশি। নড়াইল জেলা থেকে বাছাইকৃত বড় সাইজের পাটকাঠি কিনে ব্যবসায়ীরা বরিশাল, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা ও চট্টগ্রাম নিয়ে পানচাষীদের কাছে বিক্রি করেন। ছোট পাটকাঠি বর্তমানে রান্নার জ্বালানিসহ বিভিন্ন প্রকার কাগজ তৈরি, হাডবোর্ড তৈরি, পারটেক্স বোর্ড তৈরিসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ব্যাপারীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে পাটকাঠি কিনে ট্রাকে করে বিভিন্ন জেলায় পরিবহন করেন। অনেকে নদীপথে ট্রলারে খুলনা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় পরিবহন করেন। নদীপথে পরিবহন খরচ কম হওয়ায় বেশির ভাগ পাটকাঠি নদীপথেই পরিবহন করা হয়।


যশোরের অভয়নগর এলাকার ব্যবসায়ী তারা মিয়া জানান, তিনি ১১ বছর ধরে এ ব্যবসা করছেন। বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের কাছ থেকে পাটকাঠি ক্রয় করার জন্য তার প্রায় ১৫ জন ছোট ছোট ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে পাটকাঠি ক্রয় করেন। সে পাটকাঠির মধ্যে তিনি বড়গুলো বাছাই করে বরজ মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। ছোট সাইজের যে পাটকাঠি তিনি ক্রয় করেন সেগুলো ট্রাকে করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি কোম্পানিতে বিক্রি করেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর পাটকাঠির দাম একটু বেশি। প্রতি মাসে তিনি অন্তত পাঁচ ট্রাক পাটকাঠি ক্রয় করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। লাভ মোটামুটি ভালো হয়।


১১ বছর ধরে নড়াইল থেকে পাটকাঠি ক্রয় করে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার ইকবাল শেখ। তিনি বলেন, প্রতি বছর তিনি নড়াইল থেকে পাটকাঠি নিয়ে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন। নদীপথে পাঠকাঠি পরিবহন করতে খরচ অনেক কম। যেসব জেলায় নদীপথে পরিবহন করা যায় না, সেসব জেলায় তিনি ট্রাকে করে পাটকাঠি পরিবহন করেন। প্রতি সপ্তাহে তিনি দু-তিন ট্রাক পাটকাঠি নড়াইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রয় করে বিভিন্ন জেলায় পাঠান। খরচ বাদে লাভও ভালো হয়।


নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দিপক কুমার রায় বলেন, প্রতি বছর জেলায় পাটের চাষ খুব ভালো হয়। কৃষকরা আগে পাঠকাঠি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন। কিছু বড় পাঠকাঠি বরজে ব্যবহার করা হতো। তখন অনেক পাটকাঠি নষ্ট হতো। কয়েক বছর ধরে এ পাঠকাঠি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পাটকাঠির চাহিদা বেড়ে গেছে। বর্তমানে পাঠকাঠি বিক্রি করে জেলার কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন।

কোন মন্তব্য নেই