ডেঙ্গুতে জ্বর কমলেই স্কুল-অফিসে ফেরা নয়, কেন সতর্ক থাকতে হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর জ্বর কমতে শুরু করলেই অনেকের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। কেউ কাজে ফেরার প্রস্তুতি নেন, আবার অভিভাবকেরা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর কথা ভাবেন। তবে চিকিৎসাবিষয়ক নির্দেশনা অনুযায়ী, জ্বর কমে যাওয়া মানেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যাওয়া নয়। বরং এ সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার দিকে আরও বেশি নজর রাখা জরুরি।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময় বা তার পরবর্তী পর্যায়ে কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। এ সময় রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তসঞ্চালনে সমস্যা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শক দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জ্বর কমার পরও কেন ঝুঁকি থাকে
ডেঙ্গুর সংকটপূর্ণ পর্যায় সাধারণত জ্বর শুরুর কয়েক দিন পর, অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময় শুরু হয় এবং প্রায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। তবে রোগীভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে কি না, তা দিয়ে রোগীর সুস্থতা নির্ধারণ করা ঠিক নয়।
এই সময়ে রোগীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে পেটে বা বুকে তরল জমার সমস্যাও হতে পারে। বাইরে থেকে রোগীকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে গুরুতর জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে
ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে কিছু সতর্কসংকেত বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন—
তীব্র বা ক্রমাগত পেটব্যথা
বারবার বমি হওয়া
নাক, মাড়ি বা অন্য কোথাও রক্তপাত
অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ঝিমুনি বা অস্থিরতা
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নিতে অস্বস্তি
এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। গুরুতর দুর্বলতা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট বা অচেতনতার মতো পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন।
পরিবারের সদস্যদের করণীয়
ডেঙ্গু রোগীর যত্নে পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর জ্বর কমলেও তাঁর খাওয়াদাওয়া, তরল গ্রহণ, প্রস্রাবের পরিমাণ ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি ও উপযুক্ত তরল খাবার দিতে হবে। তবে রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে বা চিকিৎসক তরল গ্রহণে সীমাবদ্ধতা দিলে সেই নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা ও ফলোআপ করতে হবে।
ডেঙ্গু হলে নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর বা ব্যথার ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সুস্থ হওয়ার আগে স্কুল-অফিসে ফেরা ঠিক নয়
কয়েক দিন জ্বর থাকার পর শরীর দুর্বল হয়ে পড়া স্বাভাবিক। এ অবস্থায় দ্রুত স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে গেলে ক্লান্তি বাড়তে পারে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম ব্যাহত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে খেলাধুলা ও ছোটাছুটির কারণে শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তাই জ্বর কমলেই শিশুদের স্কুলে পাঠানো বা বড়দের অফিসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, ডেঙ্গুর তীব্রতা এবং সুস্থ হওয়ার অগ্রগতি বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থতার নিশ্চয়তা মনে না করা। সংকটপূর্ণ সময়টি সতর্কভাবে পার করা, বিপৎসংকেত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই জটিলতা এড়াতে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য-সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। রোগীর ব্যক্তিগত অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শই অগ্রাধিকার পাবে।

কোন মন্তব্য নেই