বাঙালির উৎসবের আমেজে দুর্গাপূজা, দেশজুড়ে ৩৩ হাজারের বেশি মণ্ডপে আয়োজন
নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24
ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬: শরতের উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। আগামীকাল শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল আয়োজন। পরিবার-পরিজন, বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন ভক্তরা।
এ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ডসংখ্যক মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। গত বছরের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬টি। রাজধানী ঢাকায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২৫৮টি।
ছয় দিন ধরে চলবে দুর্গোৎসব
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দুর্গাপূজা মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে উদযাপিত হয়। তবে এ বছর তিথির বিশেষ বিন্যাসের কারণে মহাসপ্তমীর পূজা দুই দিনে পড়ায় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা চলবে ছয় দিন।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী শনিবার মহাসপ্তমী এবং রোববার অতিরিক্ত মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে ঘোড়ায় চড়ে এবং পূজা শেষে তিনি নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন।
শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরা
উৎসবের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে পূজামণ্ডপগুলোতে ব্যস্ততা। প্রতিমায় রঙের শেষ আঁচড়, দেবীর সাজসজ্জা, মণ্ডপের আলোকসজ্জা এবং পূজার অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও আয়োজকেরা।
প্রতিটি পূজামণ্ডপ ঘিরে ভক্তদের প্রত্যাশা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েও দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে সামাজিক মিলনমেলার উপলক্ষ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠে উৎসবের পরিবেশ। মণ্ডপের সাজসজ্জা, প্রতিমা দর্শন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব দেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন, টানা পাঁচ দিনের অবকাশ
দুর্গাপূজা উপলক্ষে এবার সরকারি ছুটি তিন দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের অবকাশ উপভোগ করতে পারবেন।
এই দীর্ঘ ছুটি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া এবং বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখার সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য উৎসবের দিনগুলোতে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয়ের স্মারক
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, অসুররাজ মহিষাসুরের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করতে সম্মিলিত ঐশ্বরিক শক্তির প্রকাশ হিসেবে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি মহিষাসুরকে পরাজিত করেন। এই কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
দুর্গাপূজা তাই শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ন্যায়, সাহস, শক্তি ও কল্যাণের প্রত্যাশা। ভক্তদের কাছে দেবী দুর্গার আগমন অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পাশাপাশি নতুন আশার বার্তাও বহন করে।
গত ১০ অক্টোবর মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আগমনী আবহ শুরু হয়। মহালয়ার মাধ্যমে দেবীপক্ষের সূচনা এবং দেবী দুর্গার আগমনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের মধ্যে।
নিরাপদ উৎসব উদযাপনে সতর্ক থাকার আহ্বান
দুর্গাপূজা নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় নির্ধারিত পথ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করে তা লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উৎসবের সময় গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়িয়ে চলা এবং কোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা জরুরি।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। আজান ও নামাজের সময় মসজিদের আশপাশের পূজামণ্ডপে এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় শব্দযন্ত্রের ব্যবহার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে বিঘ্ন না ঘটায়, সে বিষয়ে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের সচেতন থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ
দুর্গাপূজা চলাকালে জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পেতে নিচের নম্বরগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।
পুলিশ সদরদপ্তর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ
০২২২৩৩৮০৬৬১
০২২২৩৩৮১৯৬৭
০১৩২০০০১২৯৯
০১৩২০০০১৩০০
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)
০২২২৩৩৫৫৫০০
০১৮১৭৬০২০৫০
ঢাকেশ্বরী মন্দির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ
০২৯৬১১৩৫৩
০১৭০৫৫০৫৫২৯
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ
০২২২৩৩৫৫৫৫৫
০১৭১৩০৩৮১৮১
০১৭১৩০৩৮১৮২
০১৭৩০৩৩৬৬৯৯
জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের আগে নম্বরগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো।
সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা নিয়ে দুর্গোৎসব
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয়।
দেশজুড়ে হাজারো পূজামণ্ডপে উৎসবের প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে, তখন ভক্তদের প্রত্যাশা—ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও নিরাপত্তার সমন্বয়ে উদযাপিত হবে এবারের দুর্গোৎসব। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে উৎসবটি হয়ে উঠতে পারে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল উপলক্ষ।
Times Express 24-এর পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই