রাত পোহালেই ভোট উৎসব দিয়ে দিন শুরু হবে রাজশাহীবাসি।
রাত পোয়ালেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট উৎসব। শুক্রবার সকালে শেষ হয়েছে নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। এদিন দিনব্যাপি প্রার্থী, নেতা-কর্মী-সমর্থকরা খাতা-কলম নিয়ে বসেছেন জয়-পরাজয়ের হিসাব কষতে। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে চলেছে যোগাযোগ। এছাড়াও প্রার্থীর পক্ষে পুলিং এজেন্টদের কাগজপত্র ঠিকঠাক নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
এদিকে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি শেষ। এরই মধ্যে ব্যালট বাক্সসহ ভোটের অন্যান্য সরঞ্জাম রাজশাহীর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেখান থেকে আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে কঠোর নিরপাত্তার মধ্যে দিয়ে তা প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার দিনব্যাপি রাজশাহীর ছয়টি আসনে হয়েছে প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক পক্ষে মিছিল, মিটিং ও মোটরসাইকেল শো-ডাউন। হয়েছে মাইক র্যালিও। বিশেষ করে নগরীতে একসাথে ১০-১৫টি গাড়িতে চলেছে নৌকা ও ধানের শীষের প্রচারণার আওয়াজ।
বিভিন্ন প্রতিকের পক্ষে নির্বাচনী এলাকায় নিজ নিজ প্রার্থী, নেতা-কর্মী-সমর্থকরা বিরামহীনভাবে টানা ১৯ দিন গণসংযোগ করেছেন। নির্বাচনী এলাকার গ্রামে গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়, বাড়ি-বাড়ি ও ঘরে ঘরে ভোট প্রার্থনা করেছেন তারা। যদিও শুরু দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারলেও কিছুদিন পর থেকেই অভিযোগ করে আসছিলেন। অভিযোগের পাহাড় জমেছে নির্বাচনী অফিসে। অন্যদিকে মহা ধুম-ধামে ঢাক, ঢোল পিটিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন মহাজোটের প্রার্থীরা। তারা বলছেন রাজশাহী ৬টি আসনেই নৌকা বিজয়ী হবে।
গত ১০ ডিসেম্বর থেকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে শুরু হয় প্রচারণা উৎসব। এবারের নির্বাচনে মূলত দুটো জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা হচ্ছে। দুই জোটের প্রার্থীর বাইরে আরো কিছু দল নিজ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মাঠে রয়েছেন।
এবারের নির্বাচন বিভিন্ন দিক থেকে আলাদা। এবারে সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থায় সব দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রথম বারের মতো বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পরিবারের কেউ নির্বাচনে মাঠে নেই। তাছাড়া প্রথম বারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ৬টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহৃত হচ্ছে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আছে নতুন মাত্রা। এবার সব দলের প্রার্থীরাই ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বড় হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। সব দলের প্রার্থীই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজ দল ও প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন।
রাজশাহীর ছয়টি আসনের বড় দুই দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী-৬ আসনে বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাঁধে চড়তে চাচ্ছে বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকরা। গতকাল শুক্রবার রাজশাহীর সাহেববাজার এলাকায় গণসংযোগ কালে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু এমন বার্তা দেন।
অন্যদিকে, বাকি আসনগুলোতে প্রার্থীদের প্রচারণায় শেষ হলো কাল। প্রাচরণার সুযোগ না থাকায় প্রার্থীরা বাড়িতে বসে নির্বাচনের হিসেব-নিকাশ কষছেন। প্রার্থীরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে মুঠোফোন বা আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
রাজশাহীর ছয়টি আসনের বড় দুই দলের প্রার্থীরা হলেন, রাজশাহী-১ আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী, বিএনপির প্রার্থী ব্যারিষ্টার আমিনুল হক। রাজশাহী-২ সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সাংসদ মিজানুর রহমান মিনু, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও এই আসনের সাংসদ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন ফজলে হোসেন বাদশা।
রাজশাহী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাংসদ আয়েন উদ্দিন, নগর বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন। রাজশাহী-৪ আসেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, বিএনপির প্রার্থী বিএনপির প্রার্থী আবু হেনা। রাজশাহী-৫ আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. মনসুর রহমান, বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম। রাজশাহী-৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এই আসনে বিএনপির কোন প্রার্থী নেই।
এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি শেষ। এরই মধ্যে ব্যালট বক্সসহ ভোটের অন্যান্য সরঞ্জাম রাজশাহীর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেখান থেকে আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে কঠোর নিরপাত্তার মধ্যে দিয়ে তা প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হবে।
এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে ভোটার তালিকা ও ভোটকেন্দ্র। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলোও শেষ করা হয়েছে। ফলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে এখন দারুন ব্যস্ত নির্বাচন কর্মকর্তারা। শুক্রবার ছুটির দিনেও কর্মব্যাস্ত রয়েছে নির্বাচন কার্যালয়।
জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র একদিন। দিন-ক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতিতে কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। রাজশাহীর সবক’টি আসনেরই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত। নির্বাচন কমিশন থেকে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে ভোটকেন্দ্রের তালিকাও।
ফরিদুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে রাজশাহীর প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ব্যালট বক্সসহ ভোটগ্রহণের অন্যান্য সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে। আজ কঠোর নিরপাত্তার মধ্যে দিয়ে তা প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হবে। পরদিন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ করা হবে।
চূড়ান্ত তালিকানুযায়ী মোট ভোটারের অর্ধেকেই নারী। তাই নির্বাচনে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রগুলোকে নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। সেই অনুযায়ী তারা প্রস্তুত বলেও জানান এই নির্বাচন কর্মকর্তা।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা এস.এম. আব্দুল কাদের বলেন, ভোটগ্রহণের জন্য তাদের সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণের সকল প্রক্রিয়াই এখন চূড়ান্ত। আগামী ৩০ ডিসেম্বর শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে রাজশাহীর সবগুলো আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজশাহীর চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকাগুলোতেও ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা করা নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।
রাজশাহী জেলার ৬টি আসনে এবার ভোটারসংখ্যা ১৯ লাখ ৪২ হাজার ৫৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছে ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭১০ জন এবং নারী ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫২ জন। এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীতে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৭ জন। হালনাগাদ তালিকায় এবার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৯০৫ জন। যার অর্ধেকেরও বেশি নারী ভোটার।
আর রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনের এই সংখ্যক ভোটাররা এবার জেলার ৬৯৫টি কেন্দ্রে মোট ৪ হাজার ১৩৪টি কক্ষের মাধ্যমে তাদের রায় দেবেন। বরাবরের মতো এবারও নারী ও পুরুষ ভোটারদের জন্য আলাদা ভোটকক্ষ থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই