চ্যালেঞ্জের মুখে জাতিসংঘ
আজ জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাতিসংঘের। এর ঠিক তিন বছর পর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২৪ অক্টোবরকে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।
সেই থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে ৭৪ বছর পর জাতিসংঘ এবার সেভাবে তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে পারছে না চরম অর্থ সংকটের কারণে। এ সংকট এতটাই গভীর যে, তারা তাদের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের মাসের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছে না।
শুধু বেতন দিতে না পারা নয়, সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, অঙ্গসংস্থাগুলোর কার্যক্রমও চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের পক্ষে। শুধু তাই নয়, চলমান অর্থ সংকটের কারণে নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দফতর গত শনিবার ও রোববার বন্ধ ছিল। এমন ঘটনা সংস্থাটির ইতিহাসে এই প্রথম।
জাতিসংঘ মূলত সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিচালিত হয়। তাদের বাজেটের অঙ্কটা অবশ্য কম নয়। সংস্থাটি প্রতি বছর বিভিন্ন খাতে কমপক্ষে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু এবার ধনী দেশগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করায় দেখা দিয়েছে সংকট।
অবশ্য এ নিয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলোর তেমন মাথাব্যথা নেই। কারণ জাতিসংঘ নিয়ে তারা খুব একটা ভাবে না। অথচ যেসব ধনী দেশের টাকায় জাতিসংঘ চলে, সেসব দেশের স্বার্থকে সবসময়ই প্রাধান্য দেয় সংস্থাটি। সহজ কথায় বলায় যায়, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের ইচ্ছায়ই চলে জাতিসংঘ। অথচ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল জাতিসংঘের।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর অবশ্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা এখনও ঘটেনি। তবে বিশ্বে ক্ষমতাবান দেশগুলোর কর্তৃত্ব আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনি আছে। অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে তারা গুরুত্ব দেয় না। তাই জাতিসংঘের ভূমিকা বা ক্ষমতা নিয়ে সবসময়ই উঠেছে প্রশ্ন। এখনও আছে।
বাংলাদেশের বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। সম্প্রতি জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। এর আগেও, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব রেখেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘ এ সমস্যার সমাধানে তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ইস্যুতে জাতিসংঘ ও প্রভাবশালী দেশগুলো দীর্ঘদিনেও মিয়ানমারের ওপর তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে জাতিসংঘ। তারা বলছে, শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো ঠিক হবে না। প্রশ্ন হল, তাহলে তারা কেন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না?
যদি জাতিসংঘ ও প্রভাবশালী দেশগুলোর পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর যথাযথ চাপ প্রয়োগ করা যেত, তাহলে অনেক আগেই এই সংকট দূর হতো। জাতিসংঘ বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেই অর্থে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।
এর পরও কিছু ক্ষেত্রে জাতিসংঘের গুরুত্ব এখনও রয়েছে। সেই গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে, যদি সংস্থাটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে হবে জাতিসংঘকে। বিশেষ করে ক্ষমতাশালী দেশগুলোর চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে। তবেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে জাতিসংঘ।

কোন মন্তব্য নেই