কোথায় তেমন ভিসি?
নিজেদের দুর্ভাগ্যকে সহজে আমরা অস্বীকার করতে পারব না। শুনতে যেমনই শোনা যাক না কেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান নানা অনিয়ম-অসঙ্গতি-অব্যবস্থা-দুর্নীতির ফলে সৃষ্ট মাত্রাতিরিক্ত সংশয়-সন্দেহ-অবিশ্বাস-অনাস্থা ও অস্বস্তির মধ্য দিয়ে আমরা পথ হেঁটে চলেছি। সামনের দিকে, নাকি পেছনের দিকে সে কথা প্রথমেই খোলাসা করে বলার দায় বোধ করছি না।
দেশে এখন পাবলিক ও প্রাইভেট মিলে দেড়শ’ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নের কোনো অন্ত নেই। কেবল ৪৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, আমাদের দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এখনও রোল মডেল হিসেবে গণ্য করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনিয়ম-অব্যবস্থা-অসঙ্গতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নামের তালিকায় বেশ আগেভাগেই রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পবিত্র জায়গা। এসবের কর্ণধার হিসেবে যারা রয়েছেন তারা যোগ্যতা, মেধা, পাণ্ডিত্য, ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব-বিবেকবোধ- সবদিক থেকেই হবেন আদর্শস্থানীয়- এমনটাই স্বাভাবিক ধারণা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকজন শিক্ষক থাকবেন সব ধরনের কূপমণ্ডূকতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান লাভ ও জ্ঞানদানসহ জীবন-জগতের কল্যাণ সাধনায় মগ্ন। আত্মসম্মানবোধ তো তার থাকতেই হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কারা কীভাবে আজকাল পদ-পদবি-পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন, তা এখন আর গোপন নেই। তবে একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করবেন তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সঙ্গে আত্মসম্মানবোধটাও থাকা একান্ত জরুরি।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি, দেখছি? ৪৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত দশ বা বারোটি বিশ্ববিদ্যালয়ই নানা ইস্যুতে মাসের পর মাস ধরে উত্তপ্ত। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যকার অসন্তোষ-অস্বস্তি-অস্থিরতা-ক্ষোভ-বিক্ষোভসহ তারা আন্দোলনে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব কিছুর মূলে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অলঙ্কার ভিসি পদে আসীন ব্যক্তিটি।
পদটি যত গুরুগম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন এখন আর কোনো রাখঢাক নেই, তাদের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে অধীনস্থরাই অবলীলায় পদত্যাগ, এমনকি অপসারণ দাবি করে বসছেন। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটের মাত্রাটি এমন পর্যায়ে এসে গেছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লাগাতার এমন আন্দোলন-বিক্ষোভের মুখে পদ ছেড়ে কাউকে কাউকে শেষ পর্যন্ত সরেও যেতে হয়, হচ্ছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, যে কোনো পরিস্থিতিতে মাথা উঁচু ও মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়ানোর মতো ব্যক্তিত্বের খুবই অভাব আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। এ যেন অনেকটা ‘পত্রপাঠ বিদায়!’ সবার জন্য লজ্জারই কথা। কিছুটা পেছনে দৃষ্টি দেয়া যাক-
একেবারে মি. জেমস উইলিয়াম কোলভিল থেকে শুরু করে বর্তমানে শ্রীমতী সোনালী চক্রবর্তী ব্যানার্জী পর্যন্ত (১৮৫৭-২০১৯) বিগত ১৬২ বছরের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে বিদেশি ও দেশি বাঘা বাঘা ৫১ ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডব্লিও ডব্লিও হান্টার, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, হাসান সোহরাওয়ার্দী, বিধানচন্দ্র রায়, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ।
৫১ ভিসির মধ্যে অধ্যাপক ড. সত্যেন সেন (৪ মার্চ ১৯০৯-১৪ মার্চ ১৯৮৩) একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কোনো বিরতি ছাড়া টানা সাড়ে আট বছর নিষ্ঠা ও বেশ সম্মানের সঙ্গে এ গুরুদায়িত্বটি পালন করেছেন। তার প্রশাসনিক আমলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন হয়েছে, অবরোধ এবং কখনও কখনও ক্যাম্পাসে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে; কিন্তু তিনি কখনও কারও কাছে নতি স্বীকার করেননি। যে করেই হোক, সবকিছু সামাল দিয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাকে সবসময় সবার ওপরে তুলে ধরেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে এখানে একটিমাত্র ঘটনার কথা উল্লেখ করি।
ঘটনাটি ১৯৭২ সালের। সত্যেন সেন তখন বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবখানেই তখন তার খুবই নাম-ধাম। নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির কারণে ডিগ্রি (বিএ, বিএসসি ও বিকম) পরীক্ষার্থীদের কিছু উত্তরপত্র বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গৃহীত এ সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবিতে পরীক্ষার্থীরা দফায় দফায় বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করতে থাকে।
১৩ এপ্রিল টানা ছয় ঘণ্টা অবরোধ দশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর ত্যক্ত-বিরক্ত ও অনেকটা হতাশ হয়ে ভিসি ঘটনাটির আদ্যোপান্ত জানিয়ে রাজ্য গভর্নর ও আচার্য বরাবর একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বেপরোয়া শিক্ষার্থীদের এভাবে বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচি চালাতে দিলে এবং এসব তৎপরতা যদি এখনই বন্ধ করা না যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা আছে বলে তার মনে হয় না।
অধ্যাপক ড. সত্যেন সেন রাজ্য সরকারের কাছে এ ব্যাখ্যাও চান যে, জোরপূর্বক ভিসি ও অন্যান্য সিনিয়র শিক্ষক-কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং কর্মচারীদের অফিসে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টিকারী সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের এহেন কার্যকলাপ আর কতদিন মার্জনা করা যাবে? পরদিন ১৪ এপ্রিল ১৯৭২ ‘ছাত্র বিক্ষোভ ও ঘেরাও : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের আশঙ্কা’ ঠিক এ ধরনের শিরোনামে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়।
একদিক থেকে ঘটনাটি সামান্য এবং তেমন গুরুতর কিছু না হলেও একজন ভিসি যখন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেন এবং লিখিতভাবে রাজ্য সরকারকে জানান, তখন তা আর সামান্য থাকে না। সত্যেন সেনের বেলায় ‘ঘেরাওয়ি উপাচার্য’ এবং ‘মোস্ট ঘেরাউড ভাইস চ্যান্সেলর’ এবং বিবিধ বিশেষণযুক্ত নানা কথা ও গল্প প্রচলিত আছে। তার কর্মদক্ষতা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সততা ও ব্যক্তিত্ব সবকিছু বজায় রেখে টানা সাড়ে ৮ বছর (১৯৬৮-১৯৭৬) বেশ সুনামের সঙ্গে তিনি ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আর মেধা? ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে বাইশ বছর বয়সে সত্যেন সেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ‘সিটি অব ক্যালকাটা- সোসিও ইকোনমিক সার্ভে’, ‘ইনডাস্ট্রিয়াল মুভমেন্টস ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ ইত্যাদি গবেষণাধর্মী বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।
কেবল তখনকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর ভিসি প্রফেসর সত্যেন সেন কেন, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রফেসর মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, প্রফেসর মতিন চৌধুরী বা প্রফেসর ফজলুল হালিম চৌধুরীরাই বা কম কিসে? শিক্ষকতা পেশা বা ভিসি পদটিকে তারা একেকজন যার যার ব্যক্তিত্ব ও পাণ্ডিত্য দিয়ে কতই না উপরে তুলে ধরেছেন।
আর আজ? স্বাধীনতা লাভের আটচল্লিশ বছরের মাথায় চারদিকে আমরা কী সব দেখছি? একেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কী সবের পদধ্বনি শোনা যায়! বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিস্থিতিই হোক, সত্যেন সেনের মতো করে সরকার বা আচার্যের কাছে একটি চিঠি লেখার সৎসাহস কজন ভিসি রাখেন?
বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

কোন মন্তব্য নেই