ওমিক্রন ‘সুনামি’ মোকাবেলায় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রস্তুত কি?
নতুন বছরের শুরুতে বিশ্বে আবারো করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। ওমিক্রনের দাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সংক্রমণ আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনার নতুন ধরনের এ অতিসংক্রমণ প্রবণতাকে ‘সুনামি’ আখ্যা দিয়েছে।
প্রতিবেশী ভারতেও করোনার নতুন ধরন দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে শুরু হয়েছে তৃতীয় ঢেউ। বাংলাদেশেও ওমিক্রনের উপস্থিতি মিলেছে। এখন পর্যন্ত ১৫ জন ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে প্রবেশ করছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ও কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা নেই। অবাধে মিশছে আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনদের সঙ্গে। দাওয়াতে, সামাজিক অনুষ্ঠানে, সেমিনারে, আলোচনা সভায় অংশ নিচ্ছে।
বিমানে-বাসে-ট্রেনে চড়ে যাচ্ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সম্প্রতি দেশে হঠাত্ করে করোনা সংক্রমণ ফের বাড়ার পেছনে এর একটা যোগসূত্র থাকতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে করোনা সংক্রমণ ৬০ শতাংশেরও বেড়েছে। সংক্রমণের হার এক শতাংশ থেকে প্রায় চার-সাড়ে চার শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ অবস্থায় পর্যাপ্ত জেনোম সিকোয়েন্সিং না করলে ওমিক্রনের বিস্তার কেমন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ শুরু হয়েছে কিনা, তা বোঝাটা মুশকিল।
জনস্বাস্থ্যবিদরা আশঙ্কা করছেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে দেশে ওমিক্রন বড় মাত্রায় আঘাত হানতে পারে। সেটি সামাল দিতে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি প্রস্তুত? লকডাউনের বিপরীতে ওমিক্রন ঠেকাতে জনচলাচলে কিছু বিধিনিষেধ ১৫ দফা নির্দেশনা দেয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। কিন্তু সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ মাত্রায় দ্রুত অবনতি ঘটলে কীভাবে সামাল দেবে, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবে, এ সম্পর্কে তত্পরতা আমরা এখনো খুব একটা দেখছি না। এ ব্যাপারে বোধকরি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়াটাই এখন জরুরি।
বিগত সময়ে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার হতাশাজনক চিত্রই ফুটে উঠেছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় ঢেউয়ে স্বল্প সময়ে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরেও মানুষ চিকিত্সা পায়নি। কোথাও একটা শয্যা খালি নেই। প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ নেই। আইসিইউ শয্যা, ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা নেই। এটা ছিল এক সাধারণ চিত্র। ফলে শুধু কভিড রোগী নয়, নন-কভিডের চিকিত্সাও ব্যাহত হয়েছিল। বিশেষ করে প্রসূতি ও শিশুসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। কভিড রোগী আর নন-কভিড রোগীকে কীভাবে চিকিত্সা দেয়া হবে, কোথায় দেয়া হবে, তার জন্য ছিল না সুসমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনা। এতে হাসপাতালে এসেও অনেকেই কভিডে আক্রান্ত হয়েছিল।
চিকিত্সা ছাড়াও কভিড পরীক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের দোদুল্যমানতা ছিল। কভিড সংক্রমণের বিস্তার রোধের প্রাথমিক করণীয় হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বারবার তাগিদ সত্ত্বেও দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কভিড পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রথম দিকে শুধু সরকারি সংস্থার হাতেই পরীক্ষার এখতিয়ার সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে পরীক্ষার অনুমোদন দিতে পার হয়েছিল দীর্ঘ সময়। সরকারি তরফেও পর্যাপ্তসংখ্যক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ চলেছিল ঢিমেতালে। তার মধ্যে এমন কতগুলো বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে কভিড পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, যারা ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল। এতে বহির্বিশ্বে সংকটে পড়েছিল দেশের ভাবমূর্তি।
আরো হতাশাজনক দৃশ্যপট হলো, দুর্যোগের মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ ছিল না। এন-৯৫ মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) এবং অন্যান্য চিকিত্সা সরঞ্জাম কেনা ও বিতরণের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। মোটাদাগে স্বাস্থ্য খাতে এক বিশৃঙ্খল, নৈরাজ্যিক চিত্র দেখা গিয়েছিল, যার পুনরাবৃত্তি আর কাম্য নয়। সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতাকে এখন কাজে লাগাতে হবে।
গত সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় ঢেউ দেশে অনেকটা নিষ্প্রভ হওয়া শুরু করেছিল। সংক্রমণ আস্তে আস্তে কমে আসছিল। সংগত কারণে সরকার এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নিবেদিত কভিড হাসপাতাল গুটিয়ে এনেছে। এখন আবারো যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে কয়েকটি বিষয়ে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, জেনোম সিকোয়েন্সিং যতটা সম্ভব বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা এর ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। আইডিসিসিআর অবশ্য বর্তমান সংক্রমণ প্রবণতাকে ডেল্টা সংক্রমণের কারণে ঘটছে মনে করছে। এক্ষেত্রে তারা নভেম্বরের তথ্য আমলে নিয়েছে। তাদের দাবি, এক মাসে তো পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যাবে না যে ওমিক্রনের কারণে এটি ঘটছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এতে সংশয় ব্যক্ত করছেন। তারা বলছেন, ওমিক্রনের ব্যাপকতা বুঝতে জেনোম সিকোয়েন্সিং আরো বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কভিড টেস্ট আরো বাড়াতে হবে। এখনো দেশে পরীক্ষা কম হচ্ছে। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই সক্ষমতা যাচাই করে সব সরকারি-সেরকারি হাসপাতালের জন্য পিসিআর টেস্ট সর্বজনীন করা যায় কিনা, তা ভাবার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে সরকার সারা দেশে সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য আলাদা আলাদাভাবে একটি অভিন্ন মূল্যহার বেঁধে দিতে পারে। এখন একটা মূল্যহার আছে। সেটিকে আরেকটু পরিমার্জন করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, নিবেদিত কভিড হাসপাতালগুলো পুনরায় চালু করতে হবে। সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে সে ধরনের হাসপাতালের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। শুধু হাসপাতাল বাড়ানো নয়, সেখানে আইসিইউ সুবিধা, ভেন্টিলেটর, কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেনের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত লোকবলও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দেখছি পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বেশকিছু দেশে সংক্রমণের হার বেশ ঊর্ধ্বমুখী। কাজেই সবাই চাইবে নিজেদের জনগণের প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসামগ্রী, ওষুধ, আবশ্যকীয় উপকরণ মজুদ বাড়াতে। এতে আগের মতো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। এটা বিবেচনায় নিয়ে আমাদেরও দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষায় প্রয়োজনীয়, রি-এজেন্ট, ভেন্টিলেটরসহ অন্য আবশ্যকীয় চিকিত্সা পণ্য দেশে মজুদ করতে হবে। এছাড়া ভাইরাস প্রতিরোধী মাস্ক, পিপিই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এখন ভালো মানের পিপিই তৈরিতে আমাদের পোশাক খাতগুলোও অভিজ্ঞ। তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে।
চতুর্থত, বিগত সময়ে আমরা ট্রিয়াজ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দেখেছি। কোন ধরনের রোগী কোথায় চিকিত্সা নেবে, কীভাবে চিকিত্সা দেয়া হবে, সে বিষয়টি নিশ্চিতে সমন্বিত ও টেকসই কৌশল ছিল না। এ কারণেও অনেক রোগী মারা গেছে। সুতরাং এক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।
পঞ্চমত, কাঠামোগতভাবে জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিত্সা জনবল কম, যা আছে তাও সুবিন্যাসিত নয়। এলাকাভেদে এ জনবলের উপস্থিতিও বেশ অসম। সম্প্রতি আরো চার হাজার চিকিত্সক, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও নার্স নিয়োগ দেয়ার খবর মিলছে। সামনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগের জনবলের সঙ্গে তাদেরও সুষমভাবে নিযুক্ত করতে হবে। এছাড়া বিশেষত কভিড পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মেসি প্রভৃতি বিভাগের পড়ুয়াদের কাজে লাগানো যেতে পারে। সবমিলিয়ে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
বিশ্বজুড়ে একটা আলাপ চলছে যে চলমান অতিমারী শেষ হতে ঢের বাকি কিংবা এটিই শেষ অতিমারী নয়। অনেকটা কালো রাজহাঁস দেখার ( ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্ট) মতো অপ্রত্যাশিতভাবে আরো অতিমারী সামনে আসতে পারে। জীবনযাত্রাকে আবারো অনেকটা রুদ্ধ করে দিতে পারে। কাজেই এটি সংশ্লিষ্টদের মাথায় রাখতে হবে। আমরা দেখেছি সার্সসহ আগের কয়েকটি মহামারীর শিক্ষা নিয়ে পূর্ব এশিয়ার দেশ যেমন সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ করোনা অতিমারী সফলভাবে সামাল দিয়েছে। ইবোলা মহামারী মোকাবেলা করা আফ্রিকার দেশগুলোও এক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা আমাদের জন্য পাথেয়।
কভিড অতিমারী আমাদের জন্য একই সঙ্গে দুর্যোগের, একইসঙ্গে শিক্ষারও। এর মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুকতাগুলো বারবার ফুটে উঠেছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সুন্দরভাবে বিন্যাসিত অবকাঠামো সত্ত্বেও আমরা ভালোভাবে সামাল দিতে খুব একটা সমর্থ হইনি। সুতরাং কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম একটি স্থায়িত্বশীল ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
কোন মন্তব্য নেই