ইমরান কি সত্যিই পুতিন হতে পারবেন?
ক্রিকেটে আগাম পূর্বাভাস কোনো দলের জয়ের ব্যাপারেই দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু ম্যাচের একটা পর্যায়ে চলে আসার পর বর্তমান ক্রিকেটের দুর্বলতম দল জিম্বাবুয়ের জয়ের ব্যাপারে আশা রাখা গেলেও পাকিস্তান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কেননা জিততে জিততে বহু ম্যাচ তারা হেরে বসেছে অতীতে, আবার হারতে হারতে অনেক ম্যাচ তারা জিতেছে। যে কারণে পাকিস্তানের ক্রিকেটকে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ বলা হয়।
পাকিস্তানের রাজনীতিও যদি আনপ্রেডিক্টেবল বলা হয় তাহলে খুব একটা ভুল হবে না। তাদের রাজনীতিও অনেকের ধারণার বাইরে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যাদের কোনো প্রধানমন্ত্রী এখন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেননি। এমনকি পাকিস্তান ১৩ দিনের প্রধানমন্ত্রীও দেখেছে। শুধু তাই-ই নয় দেশটিতে ১০০ দিনের কম সময় প্রধানমন্ত্রীত্ব করা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আরও দু’জন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার, মিউজিক্যাল চেয়ারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এমন একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুতিন কিংবা সি চিন পিং-এর মতো দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্নকে দিবা স্বপ্ন বলাই শ্রেয়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের পর ধরে নেওয়া হয়েছিল ইমরান খানও তার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারছেন না। ক্রিকেট মাঠে অনেক কারিশমা দেখালেও রাজনীতির মাঠ যে ভিন্ন সেটা তিনি হারে হারে টের পাচ্ছেন। যদিও তিনি ক্রিকেটার হিসেবে যেমন লড়াকু ছিলেন রাজনীতিবিদ হিসেবেও কম যাননি। কেননা ক্রিকেটে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়া এই ‘ক্যাপ্টেন’ খেলা ছাড়ার পরেই রাজনীতিতে যোগ দেন। গড়ে তোলেন নিজের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দল গঠন করলেও প্রথম দিকে তেমন সাফল্য আসেনি। কিন্তু লড়াকু ইমরান তাতে দমে যাননি। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত তার দল কোনো আসন পায়নি। ২০০২ সালে ইমরান খানই তার দল থেকে একমাত্র জয়ী হন। ২০০৮ সালে পিটিআই নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৩ সালের নির্বাচনকে ইমরান খান পাখির চোখ করেন। সেবার তার দল ভালো সাফল্য পায়। অল্পের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হতে পারেনি সেবার। তবে বাজিমাত করেন এসে ২০১৮ সালে
২২ গজের এই নেতা দল গঠনের ২২ বছর পর ক্ষমতার স্বাদ পান। ২৭২ আসনের মধ্যে পিটিআই ১১৭ আসন পেয়ে ২২ গজে ব্যাটারদের দিকে যেভাবে ইয়র্কর ছুঁড়তেন সেভাবেই অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দিকে ইমরানের এই সাফল্য ইয়র্করের চেয়ে কম ছিল না। তবে এক্ষেত্রে তার কারিশমার সাথে আরও অনেক কিছুরই যোগ ছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন। ক্ষমতায় আসতে এবং আধ্যাত্মিক নেতাদের মন জোগাতে তৃতীয়বারের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। বিয়ে করেন বুশরা মানেকাকে। তাছাড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থন তো ছিলই। সব মিলিয়ে ক্যাপ্টেনস নক খেলেছিলেন সে নির্বাচনে।
তবে যেসব বিচারে তিনি তরুণ ভোটারের মন যোগাতে পেরেছিলেন তার খুব বেশি কিছু তিনি পূরণ করতে পারেননি। বারবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেও তিনি দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারেননি। ফলে দেশের দ্রব্যমূল্য হয়েছে লাগামহীন। যে কারণে ইমরানের মতো মানুষও তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারছেন না। কথা হলো এমন একজন মানুষ, যিনি একদা ‘প্লেবয়’ ইমেজ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সেই ইমরান কি পারবেন পুতিন কিংবা সি চিন পিং হতে?
ভারতের পত্রিকা ঘাটলে অন্তত তিন থেকে চারজন নায়িকার নাম পাওয়া যাবে যাদের সাথে ইমরান খানের প্রেমের গুঞ্জন ছিল। এর মধ্যে অন্যতম রেখা। জেমিমা গোল্ডস্মিথ ছিল ইমরানের প্রথম স্ত্রী। এরপর বিয়ে করেন ব্রিটিশ পাকিস্তানি সাংবাদিক রেহাম খানকে। ইমরানের তূনের সর্বশেষ তীর হলেন বুশরা মানেকা। পাকিস্তানের মতো আপাত রক্ষণশীল একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্লেবয় ইমেজকে বিসর্জন দিতে হয়েছে ইমরানকে। এমনকি বিয়ে করতে হয়েছে আধ্যাত্মিক ঘরানার মেয়েকে। সেসব বিচারে ইমরানকে তার ক্রিকেটিয় মস্তিষ্কের মতো রাজনৈতিক মস্তিষ্ককেও বাহবা দিতে হয়। কারণ আগেই বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার মিউজিক্যাল চেয়ারের চেয়ে কম না। সেখানে টিকে থাকাও বিরাট চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনীর কাছ থেকে চ্যালেঞ্জ তো থাকেই, চ্যালেঞ্জ থাকে জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোরও।
তবে বর্তমান চ্যালেঞ্জ যে তিনি খুব ভালোভাবে সামলে নিয়েছেন তা বলা যায়। নিশ্চিত অনাস্থা প্রস্তাবকে খারিজ করে দেওয়াটা কম কৃতিত্বের না। এখন যদি নির্বাচনে বাজিমাত করতে পারেন তবে হয়তো পুতিন কিংবা সি চিন পিং-এর দেখানো পথে ইমরানকেও দেখা যেতে পারে। অনেকেরই ধারণা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় ইমরানের মস্কো সফর তার ক্ষমতা হারানোর অন্যতম কারণ। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ নেওয়াটা যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে নেয়নি। ফলে তারা তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায় এমন কথা ইমরান নিজের মুখেই বলেছেন। অর্থাৎ ইমরানের এই সংকট বাইরের দেশ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
এমনকি তিনি আরো বলেছেন- তার দেশের রাজনীতিবিদেরা ‘ছাগলের’ মতো বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ সব কিছুই ঘটছে বাইরের ইশারায়। ইমরান যদি সামনের নির্বাচনে আবার তার ক্রিকেটিয় মস্তিষ্কের মতো রাজনৈতিক মস্তিষ্ক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মান’ ভাঙ্গাতে পারেন তাহলে হয়তো আগামী নির্বাচনেও ইমরানকে বিজয়ীর বেশে দেখা যেতে পারে। কেননা ইমরানের প্রতিপক্ষরাও যে খুব ভালো অবস্থায় আছে বিষয় সেরকম না। মূল বিষয় হচ্ছে ইমরান খারাপ অবস্থায় আছে। যদি ‘অন্যান্য’ বিষয় ইমরান ঠিক রাখতে পারেন তাহলে হয়তো ইমরানের দিবা স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই