নিয়োগ পেয়েও যোগ দেননি ৩৮ শতাংশ সহকারী স্টেশনমাস্টার - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

নিয়োগ পেয়েও যোগ দেননি ৩৮ শতাংশ সহকারী স্টেশনমাস্টার



বাংলাদেশ রেলওয়েতে চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও যোগ দেননি ৩৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ সহকারী স্টেশনমাস্টার। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আদালতের নির্দেশনার পরও বেতনকাঠামো সংস্কার না করায় সহকারী স্টেশনমাস্টার পদে যোগ দিচ্ছেন না স্নাতক ডিগ্রিধারী নির্বাচিত প্রার্থীদের একটি বড় অংশ। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অপেক্ষমাণ তালিকা না থাকায় সংস্থাটি পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার কাজ শুরু করেছে।


তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ৭৩টি স্টেশন বন্ধ রেখেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম) পদে চূড়ান্ত নিয়োগ পান ৫৮৭ জন। কিন্তু যোগদান করেছেন মাত্র ৩৬২ জন। বাকি ৩৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ (২২৫ জন) নির্ধারিত সময়ে যোগ দেননি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনপ্রাপ্তির পরও বেতনকাঠামো সংস্কার না করায় সহকারী স্টেশনমাস্টার পদে যোগ দিচ্ছেন না স্নাতক ডিগ্রিধারী নির্বাচিত প্রার্থীদের একটি বড় অংশ।


গত বছরের ১৩ নভেম্বর রেলওয়ের এএসএম পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল ২০২১ সালের আগস্টে। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অপেক্ষমাণ তালিকা না রাখায় এ নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নিয়ে জটিলতায় পড়েছে কর্মী সংকটে থাকা বাংলাদেশ রেলওয়ে। 


রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টেশনমাস্টারের অত্যাবশ্যকীয় পদটির দায়িত্ব-কর্তব্য ও শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বেতনকাঠামো তুলনামূলক কম। প্রতিদিন অন্তত ১২ ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় স্টেশনমাস্টারদের। বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও এ পদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৫তম গ্রেডের। একজন এএসএম থেকে ধাপে ধাপে মূল স্টেশনমাস্টার পদে উন্নীত হতে বর্তমান নিয়োগ বিধি অনুযায়ী ২০-২২ বছর সময় লাগবে। যার কারণে স্নাতক পাস বা স্নাতকোত্তর পাস একজন চাকরিপ্রার্থী এএসএমের পরিবর্তে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য চাকরিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে বলে মনে করছেন তারা।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নিয়োগের পরও নানা কারণে অনেক প্রার্থী এএসএম পদে যোগ দেননি। সর্বোচ্চ বাছাই ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। যার কারণে যোগ্য এসব প্রার্থী হয়তো অপেক্ষাকৃত ভালো প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। বিজ্ঞপ্তি দেয়া পদ পূরণ না হওয়ায় নতুনভাবে লোকবল নিয়োগ প্রদানের কার্যক্রম শুরু করা হবে। এক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে মনে করছেন তিনি।


রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭৭ সালের সরকারি বেতনকাঠামোয় স্টেশনমাস্টার, সহকারী স্টেশনমাস্টার, স্টেশনমাস্টার গ্রেড ১ থেকে ৪ ও স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে রেলের একই পোস্টের বিভিন্ন কর্মীদের বেতনবৈষম্য সৃষ্টি হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চতর করা হলেও অন্যান্য সম পদশ্রেণীর কর্মীদের সঙ্গে বেতনবৈষম্য থাকায় রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতিসহ পাঁচজন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (নং-৭৩৩২/০৫) করে। ২০০৯ সালের ১৬ আগস্ট শুনানিতে রিটের রায় পিটিশনারদের অনুকূলে ঘোষণা দেন কোর্ট। এ রায়ের বিরুদ্ধে রেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে সিপিএলএ নং-১৫৩৪/১০ দায়ের করা হয়। সিপিএল মঞ্জুর হলে রেলওয়ে সিভিল আপিল নং-৪২/১১ দায়ের করে। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত শুনানিতে রেলের আপিল খারিজ হয়ে যায়। রিট পিটিশনের রায় বহাল থাকায় তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর থেকে একটি রিভিউ পিটিশন নং-৯৩/১৬ দায়ের করা হয়। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রিভিউ পিটিশনটি তামাদিতে খারিজ হয়ে গেলে রেলওয়ের স্টেশনমাস্টাররা গ্রেড উন্নীত করার দাবি চূড়ান্তভাবে অর্জন করে। 


জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বেতনকাঠামো সংশোধনের বিষয়ে একটি সুপারিশ পাঠানো হয়। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে একটি সুপারিশ দেয়া হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য। ওই সুপারিশে এএসএমের (সহকারী স্টেশনমাস্টার) বিদ্যমান গ্রেড ১৫ থেকে ১৩ গ্রেডে উন্নীত, এসএম-৪-এর (স্টেশনমাস্টার-৪) বেতন গ্রেড ১৪ থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত, এসএম-৩-এর বেতন ১৩ থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত, এসএম-২-এর বেতন ১২তম থেকে উন্নীত করে দশম, এসএম-১-এর বেতন গ্রেড ১১ থেকে উন্নীত করে দশম এবং স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের বেতন গ্রেড দশম থেকে নবম গ্রেডে উন্নীতের সুপারিশ করা হয়েছে।


রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ আগস্ট সমগ্রেডের পদের সঙ্গে তুলনা করে অর্থ মন্ত্রণালয় স্টেশনমাস্টারদের নতুন বেতন গ্রেড প্রদানে সম্মতি দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আছমা আরা বেগম স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্টেশনমাস্টারদের পাঁচটি পদের (স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট ব্যতীত) গ্রেড উন্নীত করার সম্মতি দেয়া হয়। রেলের সুপারিশে এএসএমের গ্রেড ১৩ থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় ১৪তম গ্রেড দেয়ার নির্দেশ দেয়। এছাড়া এসএম-৩-এর ১১তম গ্রেডের পরিবর্তে ১২তম, এসএম-২-এর দশমের স্থলে ১১তম গ্রেড দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এসএম-৪-এর গ্রেড সুপারিশ মোতাবেক ১৩তম গ্রেডই বহাল রেখেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরও আইন মন্ত্রণালয় থেকে রায়ের ওপর রিভিউ করে শুধু মামলা করা পাঁচজনের বেতনকাঠামো সংশোধনের উদ্যোগ নেয় রেলওয়ে। যার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ পদটিতে চাকরিতে আসতে নতুন কর্মীদের অনীহা বাড়ছে।


রেলওয়ের এএসএম পদের নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকে যোগদান না করার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মোখলেসুর রহমান। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্মতি জ্ঞাপনের পরও রেলওয়ে স্টেশনমাস্টারদের বেতন কাঠামো সংস্কার করছে না। রেলওয়ের মাঠ পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পদটিতে মাইলেজ, ওভারটাইমসহ অন্যান্য সুবিধা না থাকলেও নিবিড়ভাবে কাজ করতে হয়। যার কারণে নিম্নপদের এ চাকরিতে আসতে স্নাতক পাস প্রার্থীরা অনীহা প্রকাশ করছেন।


জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে রেলভবনে যোগদান শুরু হয় সহকারী স্টেশনমাস্টারদের। কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়া ৩৬২ জনের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১৮৩ জন ও পশ্চিমাঞ্চলে ১৭৯ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। পদায়িত হওয়া কর্মীদের মধ্যে একটি বড় অংশ বিসিএসের পরীক্ষার প্রয়োজনে বিশেষ অনুমতি নিয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কাজে যোগ দেয়নি। ফলে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়া ৩৬২ জনের মধ্যেও অনেকেই চূড়ান্তভাবে এএসএম পদে থাকবেন কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। 


স্টেশনমাস্টারদের সংগঠন ও  রেলওয়ের পার্সোনাল শাখার তথ্যমতে, রেলওয়ের রিক্রুটমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৮৫ অনুযায়ী একজন এএসএম কাজে যোগদানের তিন বছর পর স্টেশনমাস্টার-৪-এ পদোন্নতি পেত। তবে নতুন নিয়োগ বিধিতে গ্রেড পরিবর্তনে ন্যূনতম সময় ধরা হয়েছে পাঁচ বছর। এভাবে একজন সহকারী স্টেশনমাস্টার স্টেশনমাস্টার গ্রেড-১-এর দশম গ্রেডে উন্নীত হতে ২০ থেকে ২২ বছর সময় সময় লাগবে। বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে স্ট্যান্ডবাই হিসেবে স্টেশনে দায়িত্ব পালন, সকাল ও রাত উভয় শিফটে একনাগাড়ে কাজ করা, অন্য কর্মীদের তুলনায় ছুটি না পাওয়ার কারণে বেতন গ্রেড অনুযায়ী পদটিতে চাকরি করতে অনীহা দেখাচ্ছেন বিদ্যমান কর্মীরাও। এরই মধ্যে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষার মাধ্যমে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে রেলওয়েতে। যার কারণে এখনো সারা দেশে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সহকারী স্টেশনমাস্টারের শূন্য পদ রয়েছে ৬৫৪টি। স্টেশনমাস্টার না থাকায় সারা দেশে ৭৩টি রেলওয়ে স্টেশন দীর্ঘদিন বন্ধ রেখেছে পরিবহন বিভাগ।

কোন মন্তব্য নেই