কুমিল্লায় অযত্নে শচীন দেববর্মনের পৈতৃক বাড়ি, সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24
কুমিল্লা: উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও কালজয়ী গানের স্রষ্টা শচীন দেববর্মনের জন্ম কুমিল্লায়। নগরের দক্ষিণ চর্থায় অবস্থিত তাঁর পৈতৃক বাড়িটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হলেও বছরের বেশির ভাগ সময় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে। জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বছরে একাধিকবার মেলার আয়োজন করা হলেও বাড়িটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্থায়ী ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
২০১৮ সাল থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাড়ি প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হচ্ছে ‘শচীন মেলা’। মেলা উপলক্ষে বাড়িটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাজানো হয়। তবে বছরের বাকি সময় এর নিরাপত্তা ও দেখভাল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
১৯০৫ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার দক্ষিণ চর্থায় জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেববর্মন। ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’, ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসোনি’ এবং ‘তোরা কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া’র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি।
কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর জানান, বাড়িটিতে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন স্থানীয় নাগরিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠকেরা। বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস মিললেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
বছরের বেশির ভাগ সময় অরক্ষিত
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মেলা আয়োজনের সময় বাড়িটি পরিষ্কার করা হলেও বছরের অন্য সময় সেখানে নিয়মিত পরিচর্যা ও নিরাপত্তার ঘাটতি থাকে। অনেক সময় মাদকসেবীদের আনাগোনাও দেখা যায় বলে তাঁদের দাবি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটির দেখভালের জন্য অস্থায়ী পাহারাদার থাকার কথা থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বাড়ির বড় অংশ দখল করে সেখানে সরকারি মুরগির খামার গড়ে তোলা হয়। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দাবি ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে বাড়িটির একাংশ উদ্ধার করা হয়। পরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ করা সোয়া এক কোটি টাকা ব্যয়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাড়িটি সংস্কার করা হয়। ২০১৮ সালে সংস্কারকাজ শেষ হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটির অবস্থা আবারও নাজুক হয়ে পড়েছে। বাড়ির বেশ কিছু মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বাড়িটি সংরক্ষণের দাবিতে ২০১৪ সাল থেকে আন্দোলন করে আসছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’। সংগঠনটির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংস্কারের পর এখানে শচীন কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বাড়িটি আবারও পরিত্যক্ত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কুমিল্লার মানুষ দ্রুত এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স দেখতে চান।
সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ার পরিকল্পনা
শচীন দেববর্মনের স্মরণে প্রতিবছর কুমিল্লায় মেলার আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজিব মাহমুদ। তিনি বলেন, বছরের বিভিন্ন সময় স্থানীয় শিল্পীরাও নানা অনুষ্ঠানে শচীন দেববর্মনের গান পরিবেশন করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়িতে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। তবে বর্তমানে বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণসহ সার্বিক দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান জানান, বাড়িটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। এর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। শচীন দেববর্মনের সৃষ্টি নিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরির জন্য সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাড়িটির সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান ফটক সংস্কারের চেষ্টা চলছে।
দুই দিনব্যাপী শচীন মেলা-২০২৬
শচীন দেববর্মনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার থেকে কুমিল্লায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘শচীন মেলা-২০২৬’। দক্ষিণ চর্থায় তাঁর পৈতৃক বাড়ি প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মেলার উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক রোজী আকতার। শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে মেলার প্রথম দিনের কর্মসূচি শেষ হয়। শনিবার কুইজ প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মেলা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সংগীতের ইতিহাসে শচীন দেববর্মন
শচীন দেববর্মনের বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেব ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান ও সংগীতশিল্পী। দক্ষিণ চর্থার এই বাড়িতেই শৈশব ও কৈশোর কাটে শচীন দেববর্মনের। ১৯২৪ সালে তিনি কুমিল্লা ছেড়ে কলকাতায় যান। পরে ১৯৪৪ সালে সপরিবারে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে।
তাঁর স্ত্রী মীরা দেবী ছিলেন গায়িকা ও গীতিকার। তাঁদের একমাত্র ছেলে রাহুল দেববর্মন সংগীতজগতে আর ডি বর্মন নামে পরিচিতি লাভ করেন। শচীন দেববর্মনের পুত্রবধূ ছিলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে।
সংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তা কেবল ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবেই নয়, নতুন প্রজন্মের সংগীতচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই