পাঁচ বছরেই বদলে যেতে পারে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব, বিকল্প জ্বালানি রুটে নজর উপসাগরীয় দেশগুলোর - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

পাঁচ বছরেই বদলে যেতে পারে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব, বিকল্প জ্বালানি রুটে নজর উপসাগরীয় দেশগুলোর

 

Times Express 24 | আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো। নতুন পাইপলাইন, বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়লে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং খাতের একজন শীর্ষ নির্বাহী।

এইচএসবিসি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী জর্জেস এলহেদেরি সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ‘এইচএসবিসি ফিউচার ফোরাম’ সম্মেলনে এ বিষয়ে তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আঞ্চলিক সংকটের প্রভাব কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, কার্যকর বিকল্প বাণিজ্যপথ এবং জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা।

হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।

বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা, নৌ চলাচলে বাধা কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে।

জ্বালানি পরিবহনে এই অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন, স্থলভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা এবং বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি মাত্র সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

কেন বিকল্প পথের দিকে ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো?

মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা।

এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বিকল্প রুট তৈরি করা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলেরও অংশ।

বিকল্প পাইপলাইন ও বন্দর ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু জ্বালানি সরাসরি অন্য সমুদ্রপথে পৌঁছানো সম্ভব হলে সংকটের সময় সরবরাহ সচল রাখার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়াও সহজ হতে পারে।

তবে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ, দীর্ঘ সময় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সব জ্বালানি পরিবহনকে বিকল্প পথে সরিয়ে নেওয়াও সহজ নয়।

পাঁচ বছরে কি সত্যিই গুরুত্ব হারাবে হরমুজ প্রণালী?

জর্জেস এলহেদেরির বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, আগামী কয়েক বছরে জ্বালানি পরিবহনের প্রচলিত কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠলে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সংকটের সময় বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়বে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পাঁচ বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যে এই পথের বর্তমান অবস্থান, বিপুল পরিবহন সক্ষমতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এর গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আলাদা করে মূল্যায়ন করতে হবে।

বরং সম্ভাব্য পরিবর্তনটি হতে পারে নির্ভরতার ধরনে। আগে যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করতে হতো, ভবিষ্যতে বিকল্প ব্যবস্থা চালু হলে তার একটি অংশ অন্য পথে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্যোগ সফল হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। সংকটের সময় বিকল্প রুট ব্যবহার করার সুযোগ থাকলে পরিবহনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং বাজারে আকস্মিক সরবরাহসংকটের চাপ সামাল দেওয়া সহজ হতে পারে।

এর প্রভাব পড়তে পারে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপরও। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি করে, তাদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিকল্প রুট তৈরি হলেই জ্বালানির দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন, বৈশ্বিক চাহিদা, পরিবহন ব্যয় এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ আগামী দিনে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

আগামী পাঁচ বছরে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের পরিমাণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব এখন শুধু প্রচলিত পথের ওপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না।

প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক ডেস্ক | Times Express 24

কোন মন্তব্য নেই