কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে ১০ দেহাবশেষ উদ্ধার, দুই মালিকের একজনের নাম কেন মামলায়? - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে ১০ দেহাবশেষ উদ্ধার, দুই মালিকের একজনের নাম কেন মামলায়?


নিজস্ব প্রতিবেদক | Times Express 24

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০টি দেহাবশেষ উদ্ধারের পর তদন্ত ও দায় নির্ধারণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রিসোর্টটির ওয়েবসাইটে দুই ব্যক্তিকে মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও এ ঘটনায় করা মামলায় তাঁদের মধ্যে একজনের নাম রয়েছে। অন্য মালিকের নাম এজাহারে না থাকার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একজন আইনজীবী।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে একজন মালিকের নাম পাওয়া যাওয়ায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। পরবর্তী তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা এখনো তদন্তাধীন।

রিসোর্টের দুই মালিক, মামলায় একজনের নাম

রিসোর্টটির ওয়েবসাইটের ‘অ্যাবাউট’ অংশে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদকে মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁদের ছবি ও নামও রয়েছে।

তবে উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় তানভীর সুলতান মিয়ার নামের পাশাপাশি রিসোর্টের কয়েকজন ব্যবস্থাপনা কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন।

মামলায় চারজনের নামের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে রিসোর্টের ওয়েবসাইটে মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া দুই ব্যক্তির মধ্যে একজনের নাম মামলায় না থাকার কারণ এবং প্রত্যেকের দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

তদন্তে আরও নাম আসতে পারে: পুলিশ

দুই মালিকের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি জানতে চাইলে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, প্রথমে একজনের নাম পাওয়া গিয়েছিল। পরে অন্য মালিকের নাম সামনে আসছে। আরও তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রিসোর্টের অন্য মালিকের ঠিকানা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য দিতে পারেননি তিনি। গ্রেপ্তার ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টের কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর থেকে এসব নথি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান থাকায় এ পর্যায়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।

মামলা ও অভিযোগের ধারা নিয়ে আইনজীবীর প্রশ্ন

মামলার আসামি নির্বাচন এবং অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কক্সবাজার জেলা আদালতের আইনজীবী সেজান এহসান। তাঁর মতে, এত বড় প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দায়িত্ব কী ছিল, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রযোজ্য পরিবেশগত বিধি মানা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, এজাহারে কর্মীদের দায়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত না হলেও মালিকদের মধ্যে একজনের নাম থাকার বিষয়টি প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে তদন্তে প্রত্যেকের ভূমিকা ও দায়ের প্রমাণ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

কোন ধারায় মামলা হয়েছে?

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪এ, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় অবহেলাজনিত কাজের কারণে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। ৩৩৮ ধারায় জীবন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন করে এমন অবহেলামূলক কাজের ফলে গুরুতর আঘাতের বিষয় রয়েছে। আর ৩৪ ধারা একাধিক ব্যক্তির অভিন্ন অভিপ্রায়ে সংঘটিত কাজের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

আইনজীবীর মতে, অগ্নিনিরাপত্তা বা অনুমোদনসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা দরকার। তবে কোন অপরাধের ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাঁদের কাজের সঙ্গে প্রাণহানির সম্পর্কের ওপর।

আগুনের ঘটনায় ১০টি দেহাবশেষ উদ্ধার

গত শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানীতে অবস্থিত টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। পরে সেখান থেকে ১০টি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১১ জন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল।

এ ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিচালনার অনুমোদন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে, রিসোর্টের অন্য মালিক নিয়াজ মোর্শেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এখন গুরুত্বপূর্ণ

একটি পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডে এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শুধু মামলা দায়ের করাই শেষ কথা নয়। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, ভবন ও পরিচালনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব কতটুকু—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর প্রয়োজন।

তদন্তে যাঁর বিরুদ্ধে অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী না করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কক্সবাজারের এই মর্মান্তিক ঘটনা পর্যটন এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

Times Express 24-এর পর্যবেক্ষণ: তদন্তের ফলাফল, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।





কোন মন্তব্য নেই