নিউজ ফাস্ট

পাঁচ বছর ধরে থমকে আছে প্রাইম ব্যাংক

 

একসময় বড় ব্যবসায়ীদের ভরসাস্থল ছিল প্রাইম ব্যাংক। করপোরেট বিনিয়োগে ব্যাংকটির ছিল শক্তিশালী ভিত। রিটেইলে নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যও প্রশংসিত ছিল ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে সমসাময়িক অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশ এগিয়ে ছিল প্রাইম ব্যাংক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে বিবর্ণ হয়ে পড়ছে ব্যাংকটি।


পাঁচ বছর ধরে অস্বাভাবিক স্থবিরতা বিরাজ করছে প্রাইম ব্যাংকে। থমকে গেছে ব্যাংকটির আমানত ও সম্পদের প্রবৃদ্ধি। হতাশাজনক পরিস্থিতি ব্যাংকটির মুনাফায়ও। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যবধান তৈরি হওয়ায় প্রাইম ব্যাংক ছেড়ে যাচ্ছে বড় গ্রাহকরা। খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণও বাড়ছে ক্রমাগত। সব মিলিয়ে জৌলুশ হারানো প্রাইম ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে অবস্থানও হারাচ্ছে।


২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। অথচ এ সময়ে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশের বেশি। যদিও ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, প্রাইম ব্যাংকের ঋণে প্রবৃদ্ধি না হয়ে উল্টো কমেছে।


ঋণের প্রবৃদ্ধির চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি প্রাইম ব্যাংকের আমানতে। ২০১৪ সাল শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। সাড়ে পাঁচ বছর পর চলতি বছরের জুনে আমানতের পরিমাণ ২২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। মাঝে চার বছর প্রাইম ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক।


প্রাইম ব্যাংকের পরিচালন ও নিট মুনাফার প্রবৃদ্ধিতেও ভাটা পড়েছে। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬১৫ কোটি টাকা। এরপর টানা চার বছর প্রাইম ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৬০০ কোটি টাকার নিচে। ২০১৯ সালে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ২৮ শতাংশ কমেছে।


পরিচালন মুনাফার চেয়েও খারাপ চিত্র নিট মুনাফায়। ২০১৪ সালে ২৩৯ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল প্রাইম ব্যাংক। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের পরিস্থিতিতে ফেরেনি। উল্টো চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রাইম ব্যাংকের নিট মুনাফায় ৪৭ শতাংশ পতন হয়েছে।


লোকসান গুনছে প্রাইম ব্যাংকের দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানও, যা দুর্বল করে দিচ্ছে ব্যাংকের ভিত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ছে প্রাইম ব্যাংকের। আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো দেখাতে প্রতিনিয়ত খেলাপি ঋণ অবলোপনের পথে হাঁটছে ব্যাংকটি। ২০১৯ সাল শেষে মামলায় আটকা পড়েছে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ও অবলোপনকৃত ৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার ঋণ।


কার্যক্রমে স্থবিরতা থাকলেও একে ‘কৌশল’ বলছেন প্রাইম ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী রাহেল আহমেদ। তার ভাষ্য, গত পাঁচ বছর প্রাইম ব্যাংক সম্প্রসারণের চেয়ে ভিত মজবুতে বেশি নজর দিয়েছে। ২০১৫ সালে প্রাইম ব্যাংককে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ব্যাংকের সব কার্যক্রম সেন্ট্রালাইজেশন মডেলে নেয়ার প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এ কারণে প্রাইম ব্যাংক আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধিতে জোর না দিয়ে গুণগত মান বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ২০১৯ সাল থেকে আমরা প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছি। করোনার মধ্যেও প্রাইম ব্যাংকের আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।


প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই করপোরেট ব্যাংকিংয়ে জোর দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে প্রাইম ব্যাংক। ফলে ব্যাংকটির ঋণের সিংহভাগই বড় করপোরেটে সীমাবদ্ধ। ২০১৯ সাল শেষে প্রাইম ব্যাংকের বিতরণকৃত ২১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকাই ছিল শিল্পঋণ। এসএমই খাতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। কৃষিতে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ রয়েছে নামমাত্র। ঋণ পোর্টফোলিওর বৃহৎ অংশই বড় করপোরেটে কেন্দ্রীভূত থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক। করোনাভাইরাস সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ সে ঝুঁকিকে আরো উসকে দিয়েছে।


যদিও ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দাবি, প্রাইম ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও যথেষ্ট ভালো আছে। রাহেল আহমেদ বলেন, করপোরেট ঋণগুলোকে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ৯০ শতাংশ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। প্রণোদনার অর্থ ছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণগ্রহীতাদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।


কাগজে-কলমে গত পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণ কমিয়েছে প্রাইম ব্যাংক। যদিও এ সময়ে অবলোপনকৃত ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে ব্যাংকটির। ২০১৫ সালে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। ওই সময় ব্যাংকটির ৯২৬ কোটি টাকা ছিল অবলোপনকৃত ঋণ। ২০১৯ সাল শেষে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে ৯৯৬ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। যদিও এ সময়ে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রাইম ব্যাংকের মামলাভুক্ত খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সে হিসাবে গত পাঁচ বছরে প্রাইম ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণ না কমে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার কারণে চলতি বছর ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার পথ বন্ধ রয়েছে।


প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নগরকেন্দ্রিক ব্যাংকিং থেকে বেরোতে পারেনি প্রাইম ব্যাংক। ব্যাংকটির ঋণের ৯৮ শতাংশই বিতরণ করা হয়েছে শহরাঞ্চলে। ডিসেম্বর শেষে প্রাইম ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। এ ঋণের মধ্যে ১৭ হাজার ১৭৮ কোটি টাকাই ঢাকায় বিতরণ করা হয়েছে। সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রাইম ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে মাত্র ৪৫২ কোটি টাকা।


সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নেও এসএমই ও কৃষি খাত উপেক্ষিত হচ্ছে প্রাইম ব্যাংকে। বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের ৯০ শতাংশ বিতরণ করলেও এসএমই খাতে ব্যাংকটির বিতরণ অর্ধেকও হয়নি। কৃষি খাতের প্রণোদনার অর্থ বিতরণে প্রাইম ব্যাংকের অর্জন ১ শতাংশেরও কম। ঋণ বিতরণে প্রাইম ব্যাংকের স্থবিরতার চিত্র দেখা যাচ্ছে ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনেও। চলতি বছরের প্রথমার্ধের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ৩০ জুন পর্যন্ত প্রাইম ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ না বেড়ে উল্টো কমেছে। ২০১৯ সালের জুনে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে এসে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ ২১ হাজার ২১৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সে হিসাবে এক বছরে প্রাইম ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ কমেছে ৩৭৫ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।


প্রাইম ব্যাংকের দুটি সাবসিডিয়ারি বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানও লোকসান গুনছে। ২০১৯ সালে প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড লোকসান দিয়েছে ৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। এ দুই প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসান চাপ বাড়াচ্ছে প্রাইম ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে।


সূত্র: বণিক বার্তা 

No comments