নাটোরের সবকটি আসনেই অপ্রতিরোধ্য আ.লীগ প্রার্থীরা
নাটোরের চারটি সংসদীয় আসনেই নৌকা প্রতীকে অপ্রতিরোধ্য চার প্রার্থী। চারটি আসনে নৌকা প্রতীকের এই চার জনসহ মোট ২০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। চারটি আসনেই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক প্রার্থীদের দখলে রয়েছে মাঠ। বিএনপিসহ অন্যান্য দলের আরো ১৬ প্রার্থীর দেখা নেই তেমন। তবে বিএনপি প্রার্থীদের অভিযোগ তাদের কর্মী-সমর্থকদের নির্যাতন করা সহ পোষ্টার লিফলেট ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর নাম করে নেতা কর্মীদের উঠিয়ে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে ধানের শীষের প্রচারনা থেকে সরে আসার জন্য বলা হচ্ছে। না বলা হচ্ছে জীবনে শেষ করার। এমন কি প্রার্থীকেও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে গায়েবী মামলা করা হচ্ছে। এছাড়া মামলা ছাড়াই পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তার করছে। বিএনপি সহ বিরোধী প্রার্থীদের এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবী করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।
জেলা রিটার্নিং অফিস সূত্রে জানা যায়, নাটোরের চারটি আসনের মধ্যে নির্বাচনী এলাকা ৫৮, লালপুর-বাগাতিপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-১ আসনে সর্বাধিক ৬ প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামীলীগের হয়ে লড়ছেন শহিদুল ইসলাম বকুল, বিএনপির অধ্যক্ষ কামরুন নাহার শিরীন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মুনজুরুল ইসলাম বিমল, জাতীয়পার্টির আবু তালহা, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওর্য়াকার্স পার্টির আনছার আলী দুলাল, ইসলামী আন্দোলনের খালেকুজ্জামান এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাকসুদুর রহমান। নির্বাচনী এলাকা ৫৯, সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-২ আসনে চার প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বর্তমান সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল, বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি, জাতীয় পার্টির মজিবুর রহমান সেন্টু ও ইসলামী আন্দোলনের আজিজার রহমান খান চৌধুরী আমেল। নির্বাচনী এলাকা ৬০, সিংড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-৩ আসনে ৫ প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের হয়ে লড়ছেন বর্তমান সাংসদ ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বিএনপির দাউদার মাহমুদ,জাতীয় পার্টির আনিসুর রহমান, বিকল্প ধারার মনজুরুল আলম হাসু ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শাহ মোস্তাফা ওয়ালীউল্লাহ।
এছাড়া নির্বাচনী এলাকা ৬১, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-৪ আসনে ৫ প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামীলীগের হয়ে লড়ছেন বর্তমান সাংসদ এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, বিএনপির আব্দুল আজিজ, জার্তীয় পার্টির আলাউদ্দিন মৃধা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বদুল আমিন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) হারুন-অর-রশিদ। প্রতীক বরাদ্দের পর পরই আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের প্রচনার গতি বৃদ্ধি পেলেও অন্য দলের প্রার্থীদের প্রচারনায় গতি স্লথ। এর মধ্যে নাটোর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বার বার প্রার্থী পরিবর্তনে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সহ হতাশা দেখা দেয়। প্রথমে বিএনপির প্রয়াত নেতা সাবেক মন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের সহধর্মীনি অধ্যক্ষ কামরুন নাহার শিরীনকে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রার্থীতা প্রত্যাহারের দিন হঠাৎ করেই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মুনজুরুল ইসলাম বিমলকে ধানের শীষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ কামরুন নাহার শিরীন এনিয়ে আদালতের সরনাপন্ন হন এবং আদালতের নির্দেশে পুনরায় ধানের শীষ ফিরে পান। কিন্তু প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে এই টানাপোড়েনের কারনে দলের কর্মী সমর্থক এবং সাধারন ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় অনেকেই নৌকা প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন। স্থানীয়দের অনেকেই রসালো সুরে বলছেন, ধানের আঁটি কমছে, হাওয়ার গতি বেড়েছে নৌকার পালে।
অপরদিকে, নাটোর সদর আসনে বিএনপির রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর প্রার্থীতা বাতিল হলে তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ বরাদ্দ পান। কিন্তু স্বামীর প্রার্থীতার জন্য আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষার কারণে প্রচারে নামতে দেরী হয়। একারণে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়া দলের অনেক নেতা কর্মী ইতিমধ্যে আওয়ামীলীগে যোগ দিয়ে নৌকার পাল ভাড়ি করছেন। ফলে এই আসনেও নৌকা এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।
তবে বিএনপির প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি অভিযোগ করেছেন,তার নেতা কর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। কুপিয়ে জখম করা হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতাসহ কর্মী সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এছাড়ার তার ওপরও হামলা চালানো হচ্ছে। প্রচারে নানাভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পোষ্টার ছিড়ে ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনী ক্যাম্প করার আগেই নেতা কর্মী ও সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা হামলার শিকার হচ্ছে।
তবে আওয়ামীলীগ প্রার্থী শফিকুল ইসলাম শিমুল এই অভিযোগকে অসত্য দাবী করে বলেছেন,শহরে প্রচারনার সময় তিনি নিজে তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। এসময় তিনি তাকে নির্বিঘ্নে প্রচারনা চালানোর জন্য বলেছেন। সে জন্য তাকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু উল্টো মিথ্যার করে সাধারণ ভোটারদের কাছে টানার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন,তার স্বামী বাংলাভাইয়ের গড ফাদার দুলুর অপকর্মের জবাব দিতে না পেরে এসব মিথ্যার আ¤্রয় নিচ্ছেন। এই আসনে অপর দুই প্রার্থীর মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মুজিবুর রহমান সেন্টুর প্রচরনা কিছুটা হলেও চোখে পড়ছে। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আজিজার রহমান চৌধুরী আমেলের প্রচারনায় তীব্রতা নেই।
নাটোর-৩ সিংড়া আসনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী জুনাইদ আহমেদ পলকের নৌকা অপ্রতিরোধ্য। শনিবার তার পক্ষে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে বিকল্পধারা প্রার্থী মনজুরুল আলম হাসু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষনা দিলে এই আসনে নৌকা আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। বিএনপির প্রার্থী দাউদার মাহমুদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অভিযোগ থাকায় দলের নেতা কর্মীরাই দুরে সরে রয়েছেন। অনেকেই ক্ষোভের কারণে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন। একারনে জুনাইদ আহমেদ পলক আবারও নির্বাচিত হবেন বলেই ধরে নিচ্ছেন স্থানীয় ভোটাররা। দাউদার মাহমুদও একই অভিযোগ করে বলেছেন, তার প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে।
নাটোর-৪ আসনের মাঠ দখলে রয়েছে নৌকা। দলীয় নেতা কর্মীদের সাথে সাধারণ ভোটাররাও নৌকা মার্কা প্রতীকের পক্ষে প্রচার করছেন। প্রতিদিন কাক ডাকা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে নৌকা প্রতীকের প্রচরনা। এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীসহ ৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বি করলেও প্রচারণা চলছে শুধু নৌকা প্রতীকের। নাটোরের চারটি অসনেই একই অবস্থা। বিজিবি ও সেনা বাহিনী নামার পরও বিরোধী প্রার্থীদের তেমন প্রচারণা নেই। তাই নৌকা প্রতীক অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। সাধারণ ভোটারদের অনেকেই মনে করছেন এভাবে এক দলের প্রচরণায় নির্বাচনী আমেজ নেই।
হলে নির্বাচন হবে একতরফা। তবে নির্বাচন বিশ্লেষক ও সচেতন ভোটাররা বলছেন, আগামী সংসদ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে? বিরোধী জোট কতটা ভোটের মাঠে টিকতে পারবে? মোটামুটি সুষ্ঠু ভোট হলে নাটোরের চারটি আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে।
নাটোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক অভিযোগ করে বলেছেন, এমপি শিমুল তার হেলমেট বাহিনী দিয়ে প্রতিদিন বিএনপি কর্মীদের কাজে বাধা দিচ্ছে। মারপিট করে মোটর সাইকেল মোবাইল টাকা পয়সা ছিনিয়ে নিচ্ছে। কাজ করতে দিচ্ছে না। প্রচার মাইক ভেঙ্গে দিচ্ছে। পোষ্টার লাগাতে দিচ্ছে না। প্রার্থীর উপরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সব বিষয়ে রিটানিং অফিসারকে জানিয়েও কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। জেলার বিএনপির ৩ শীর্ষ নেতা এবং ধানের শীষের প্রার্থীর প্রধান সমন্বয়কারীসহ অর্ধশত নেতাকর্মীকে আটক করে এখানে ধানের শীষের প্রার্থীকে কোনঠাসা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। দলের নেতা কর্মীরা বিএনপি ছেড়ে দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার কারন হিসেবে তিনি বলেন, নিরপত্তার জন্য হয়ত তারা ওই দলে যোগ দিচ্ছেন। পরিবেশ স্বাভাবিক হলে তারা আবার ঘরে ফিরে আসবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরিবেশ সুষ্ঠ হলে আওয়ামী লীগ পালে হাওয়া পাবেনা।
জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোর্ত্তুজা আলী বাবলু এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, বিএনপি নেতা বাংলাভাইয়ের গড ফাদার রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর অপকর্মের কথা মানুষ দীর্ঘদিনেও ভুলতে পারেনি। ভোলেনি রামসার কাজীপুর গ্রামের ৪৭ বাড়িতে হামলা করে বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে লুটপাট করা, মা বোনদের ইজ্জত হনন করা, মানুষ হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা, বড়াইগ্রামের ডাঃ আয়নাল হক হত্যা সহ বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের কথা। মানুষ এখনও তার নাম শুনলে আতংকে শিউরে ওঠে। বিএনপি মিথ্যাচার করে মানুষের মন গলাতে চাচ্ছে। তাই মানুষ বিএনপি-জামায়াত জোটকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায়না। এখন সকলেই নৌকা প্রতীকের বিজয়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এবারও নাটোরের চারটি আসনে নৌকা বিজয়ী হবে।

কোন মন্তব্য নেই