রিজার্ভ চুরির পাঁচ বছর পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা কাটেনি - TIMES EXPRESS | টাইমস এক্সপ্রেস is an interactive news portal

নিউজ ফাস্ট

রিজার্ভ চুরির পাঁচ বছর পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা কাটেনি



দেশে আন্তঃব্যাংক ডিজিটাল লেনদেনের অন্যতম একটি মাধ্যম ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার বা ইএফটি। এক দশক আগে সেবাটি চালু হলেও তুলনামূলকভাবে এর পরিসর ছিল সীমিত। কিন্তু চলমান মহামারীতে ইএফটির মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে। লেনদেনের বাড়তি চাপ সামলাতে না পেরে ১৩ এপ্রিল অকার্যকর হয়ে পড়ে ইএফটি, যা আবার চালু করতে সময় লেগেছে প্রায় এক সপ্তাহ।


ইএফটির মতোই ১৩ এপ্রিল অকার্যকর হয়ে যায় আন্তঃব্যাংক চেক নিষ্পত্তির প্রধান মাধ্যম বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ (বিএসিএইচ)। একই দিন আন্তঃব্যাংক রেপো ও কলমানি লেনদেনের এমআই মডিউলও অকার্যকর হয়ে যায়। কারিগরি ত্রুটির শিকার হয়ে ডাউন হয়ে যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তিগত এ বিপর্যয়ের ফলে থমকে যায় দেশের ব্যাংক খাতের পেমেন্ট ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেমেন্ট ব্যবস্থায় যে বিপর্যয় হয়েছে, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথম।


হঠাৎ করে ব্যাংক খাতের পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করেছে বণিক বার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ইনফরমেশন সিস্টেমস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হয়। মতামত নেয়া হয় ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রযুক্তি সহায়তা দেয়া প্রতিষ্ঠান ও আইটি বিশেষজ্ঞদের।


তারা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতের লেনদেনের আকার ও পরিমাণ বিচারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তি সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল। রিজার্ভ চুরি হওয়ার পরও প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে যথাযথ নজর দেয়া হয়নি। ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক পুরোপুরি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠাননির্ভর। দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়া কিংবা নিজস্ব জনবলকে দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মনোযোগ দেয়া হয়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগও যৎসামান্য। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত ভঙ্গুরতা কাটেনি। উল্টো ত্রুটি-বিচ্যুতি সারিয়ে তুলতে কর্মকর্তাদের উদাসীনতা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলছে।


১৩ এপ্রিল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিপর্যয় হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি সার্ভারের সংযোগকারী বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল সংযোগের ত্রুটির কারণে পেমেন্ট ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, বিটিসিএলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল ৪০ মিনিট। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন ব্যবস্থা ঠিক হতে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেদিনও ইএফটির মাধ্যমে লেনদেন করা সম্ভব হয়নি।


এ বিষয়ে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রফিকুল মতিন বণিক বার্তাকে বলেন, ১৩ এপ্রিল বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে বিটিসিএলের সংযোগের সমস্যার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়। ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে ৪টা ২০ মিনিটের মধ্যে আমরা ত্রুটি সারিয়ে দিই। পেমেন্ট ব্যবস্থায় যে সংকটটি হয়েছে, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সমস্যার কারণে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করে আমাদের চিঠিও দেয়া হয়।


পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। দেশ-বিদেশে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়া ঘটনাটি নিয়ে মামলা চলছে কয়েকটি দেশে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের তাগিদ ছিল প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর। যদিও পরিস্থিতি বলছে, এখনো তথ্যপ্রযুক্তির ভঙ্গুরতা নিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে পেমেন্ট ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মাধ্যমে বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৩ সালে। এ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেন্ট্রাল ব্যাংক স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্টের (সিবিএসপি) আওতায়। পেপারলেস ব্যাংকিং ব্যবস্থা রূপান্তরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেড় শতাধিক সার্ভার, চার হাজারের বেশি কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক প্রিন্টার ও স্ক্যানার স্থাপন করা হয়। উদ্যোগ নেয়া হয় দেশের সব লেনদেন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার।


পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০১০ সালে রিটেইল পেমেন্ট প্লাটফর্ম বাংলাদেশ অটোমেটেড চেক প্রসেসিং সিস্টেমসের (বিএসিএইচ) কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন) ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস। ২০১২ সালে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইস অব বাংলাদেশ (এনপিএসবি) এবং ২০১৫ সালে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট সিস্টেমসের (আরটিজিএস) কার্যক্রম শুরু হয়। আর আরটিজিএস স্থাপনের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছিল।


বিএসিএইচ প্রতিষ্ঠার পর এটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হয়। আর দুর্যোগকালে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য মিরপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে স্থাপন করা হয় ডিজাস্টার রিকভারি সাইট। বিএসিএইচের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সনাতনী পদ্ধতির নিকাশ ব্যবস্থার পরিবর্তে উন্নত বিশ্বের মতো ইমেজ বিনিময় পদ্ধতির চেক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। দেশের আন্তঃব্যাংক লেনদেনের প্রধানতম মাধ্যম এটি। গত জানুয়ারি মাসে বিএসিএইচের মাধ্যমে ২ লাখ ৬ হাজার ১২৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। মোট ১৯ লাখ ১২ হাজার ৫৫১টি চেকের মাধ্যমে এ অর্থ লেনদেন হয়। মাসে গড়ে ২০ কর্মদিবস ধরলে জানুয়ারিতে প্রতিদিন ৯৫ হাজার ৬২৭টি চেক নিষ্পত্তি হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হয়েছে ১০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা।

গত ১৩ এপ্রিল বিএসিএইচের মতিঝিল সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত বিটিসিএলের একটি সংযোগে ত্রুটি হলে পুরো লেনদেন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। অথচ একটি সার্ভারে ত্রুটি হলে অন্যটির মাধ্যমে লেনদেন সক্রিয় থাকার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রমতে, ক্লাস্টারিং সিস্টেমের মাধ্যমে ১৪ জোড়া কম্পিউটারের মাধ্যমে লেনদেন ব্যবস্থা পরিচালিত হতো। এক্ষেত্রে একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে হওয়া লেনদেনের তথ্য আপডেট হতো অন্য কম্পিউটারে। কিন্তু প্রায় ১১ মাস আগে লাইনে সমস্যার কারণে প্রতি জোড়া কম্পিউটারের একটির লাইন বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এতে একটি কম্পিউটারের তথ্য অন্য কম্পিউটার বা সার্ভারে আপডেট হয়নি। ফলে বিটিসিএলের লাইনে সমস্যা হওয়ার পর পুরো বিএসিএইচ সিস্টেমই অকার্যকর হয়ে যায়। একই পরিস্থিতি হয়েছিল বিইএফটিএনের ক্ষেত্রেও।

কোন মন্তব্য নেই